ট্রাম্পের কব্জায় রিপাবলিকান দল

36

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা পরবর্তী প্রথম প্রকাশ্য সমাবেশে বক্তৃতা দেওয়ার আগেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে রক্ষণশীলদের এক সম্মেলনে কাল রোববার বক্তৃতা দেওয়ার কথা তাঁর। ক্যাপিটল হিলে হামলায় ট্রাম্পের সংশ্লিষ্টতা থাকার কারণে ফ্লোরিডার সমাবেশে ট্রাম্পের বক্তৃতা দেওয়া উচিত নয় বলে বলেছেন এলিজাবেথ চেনি। আর এতেই তিনি পড়েছেন বিপাকে। রক্ষণশীল রিপাবলিকানদের পক্ষ থেকে তাঁর পদত্যাগের দাবি উঠছে।

২৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে শুরু হয়েছে রক্ষণশীলদের গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন। নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয় মেনে নিতে পারেনি মার্কিন রিপাবলিকান রক্ষণশীলরা। ‘কনজারভেটিভ অ্যাকশন পলিটিক্যাল কনফারেন্স’–এর ব্যানারে রক্ষণশীলদের সমাবেশ ঘটেছে ফ্লোরিডায়।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে এমন আর কখনো দেখা যায়নি। ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার ১০০ দিনের মধ্যেই একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট আবার মঞ্চে উপস্থিত হচ্ছেন। রিপাবলিকান দলের জাতীয় কমিটি থাকলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পই এখন এই দলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা।

সিনেটে রিপাবলিকান দলের নেতা মিচ ম্যাককনেল ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কথা বলে এখন অনেকটাই কোণঠাসা। রিপাবলিকান দল ট্রাম্পের কতটা অনুগত, তা প্রমাণের চেষ্টা চলছে সর্বত্র। ক্যাপিটল হিলে হামলার জন্য ট্রাম্পের নৈতিক দায় আছে বলে বলেছিলেন সিনেটর মিচ ম্যাককনেল। যদিও অভিশংসন আদালতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দণ্ডের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন তিনি। এরপরও তাঁকে ট্রাম্পের রোষানলে পড়তে হয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, মিচ ম্যাককনেলের পেছন না ছাড়লে রিপাবলিকানরা নির্বাচনে জয়ী হতে পারবে না।

নিজেকেই এখন সামাল দিতে হচ্ছে সিনেটর মিচ ম্যাককনেলকে। ২৫ ফেব্রুয়ারি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ২০২৪ সালের জন্য ট্রাম্প দলীয় মনোনয়ন পেলে তিনি সমর্থন দেবেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য দেখানোই এখন রিপাবলিকান দলের অধিকাংশ নেতার কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিচিত সব চরম রক্ষণশীল রাজনীতিবিদদের সমাবেশ ঘটেছে ফ্লোরিডার সম্মেলনে। সিনেটর টেড ক্রুজ, সিনেটর টম কটন, সিনেটর হোসে হাওলি, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও, টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন, গভর্নর ক্রিস্টি নোয়েমসহ রক্ষণশীল তারকারা সবাই হাজির ফ্লোরিডায়।

২০২৪ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ট্রাম্প ছাড়া অন্য কেউ হতে পারেন, এমন কথা কারও আলোচনায়ই নেই এখনো। যদিও ফ্লোরিডা সমাবেশে উপস্থিত এমন অনেকের মধ্যেই এমন বাসনা রয়েছে। চরম রক্ষণশীলতার দিকে ঝুঁকে পড়া রিপাবলিকান দলে উদারনৈতিক বা মধ্যপন্থীরা এখন কোনো আলোচনায় নেই। যদিও কাল ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলবেন কিনা, এখনো নিশ্চিত নয়।

রক্ষণশীলদের সমাবেশে প্রথম দিনেই প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও উদারনৈতিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের অভিবাসন নীতিকেই শুরুতে আক্রমণ করা হচ্ছে। রক্ষণশীলদের কাছে অভিবাসন ভীতিকে ট্রাম্প উসকে দিয়েছিলেন। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের নানা ফন্দি করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট বাইডেন ক্ষমতায় এসেই মার্কিন অভিবাসনকে সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছেন।

রক্ষণশীলদের প্রভাবশালী সমাবেশ থেকে ‘স্টপবাইডেনএজেন্ডা ডট কম’–এর প্রচারণায় বলা হয়েছে, নির্বাচনে জালিয়াতি বন্ধ করতে হবে। ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে জড়ো হওয়া অধিকাংশ রক্ষণশীলদের বিশ্বাস, গত নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। নির্বাচনের ব্যাপারে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

জো বাইডেন অভিবাসন নিয়ে অ্যামনেস্টি দিচ্ছেন উল্লেখ করে ‘স্টপবাইডেনএজেন্ডা ডট কম’–এ এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেনের কর বিবরণী ও অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যের বিষয়ে তদন্ত করতে বিশেষ কাউন্সেলর নিয়োগের দাবি জানানো হয়েছে এই ওয়েবসাইটে।

‘কনজারভেটিভ অ্যাকশন পলিটিক্যাল কনফারেন্স’ নামের রক্ষণশীল সংগঠনটি দীর্ঘদিন থেকেই রিপাবলিকান দলের বাইরে থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। ২০১৬ সালের নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘কনজারভেটিভ অ্যাকশন পলিটিক্যাল কনফারেন্স’–এ উপস্থিতই ছিলেন না। মাত্র চার বছরে অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে। এবার সম্মেলন হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরেই।

দুই দফা অভিশংসনের শিকার হয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০ জানুয়ারি ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পই এখনো সংবাদ শিরোনামে আছেন।

প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকান দলের নেতা কেভিন ম্যাকার্থি গত বুধবার বলেছেন, তিনি মনে করেন ‘কনজারভেটিভ অ্যাকশন পলিটিক্যাল কনফারেন্স’ আয়োজিত সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। এরপরই কংগ্রেসে ট্রাম্পবিরোধী হিসেবে পরিচিত এলিজাবেথ চেনি বলেন, ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার জন্য ট্রাম্পের দায় আছে। তিনি মনে করেন, এ সম্মেলনে ট্রাম্পের উপস্থিত না থাকাই উচিত।

রিপাবলিকান দলের তৃতীয় শীর্ষ নেতা এলিজাবেথ চেনি। তিনি প্রতিনিধি পরিষদে দলের কনফারেন্স কমিটির চেয়ারপারসন। কংগ্রেসে ট্রাম্পের অভিশংসনের সময়ও দলের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ভোট দিয়েছেন।

কংগ্রেসে ফ্রিডম ককাস নামে রক্ষণশীল আইন প্রণেতাদের একটি পৃথক সংগঠন রয়েছে। ফ্রিডম ককাস সংবাদ সম্মেলন করে এলিজাবেথ চেনিকে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির চেয়ারপারসন এন্ডি বিগস বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য রিপাবলিকান দলে এখন কোনো সুযোগই নেই।

জর্জিয়া থেকে নির্বাচিত আরেক আইন প্রণেতা মারজুরি টেইলর গ্রিন বলেন, রিপাবলিকান দলে লিজ চেনিসহ অন্য যারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, তারা একদম বোকা। এসব সমালোচনাকারী রিপাবলিকান দলের ভিত্তির সঙ্গে সংযোগহীন।

রিপাবলিকান দলের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভিত্তি এখন এতই শক্তিশালী যে, তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া আইন প্রণেতারা নিজেদের রাজ্যে দলীয় নেতা–কর্মীদের বিরোধিতার মুখে পড়ছেন। রাজ্য রিপাবলিকান দল তাদের নিষিদ্ধ করছে। কংগ্রেসওম্যান এলিজাবেথ চেনিকেও তাঁর রাজ্যের রিপাবলিকানরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

কংগ্রেসে রিপাবলিকান ককাসের নেতৃত্ব থেকে এলিজাবেথ চেনিকে সরাতে আগে থেকেই চেষ্টা করা হচ্ছে। সম্প্রতি প্রতিনিধি পরিষদে এক গোপন ভোটে ৬১ জন ট্রাম্প অনুরাগী আইনপ্রণেতা তাঁকে নেতৃত্ব থেকে সরানোর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। ১৪৫ জন এলিজাবেথ চেনির পক্ষে ভোট দেওয়ায় সে সময় তাঁর নেতৃত্ব রক্ষা পেয়েছে।