অন্যরকম এক ঈদ নিউ ইয়র্কে

101
ফাইল ছবি

একেবারে অচেনা, অন্যরকম এক ঈদ এসেছে নিউ ইয়র্কের মুসলমানদের জীবনে। আজ রোববার এখানে পবিত্র ঈদ-উল ফিতর। কিন্তু আগের বছরগুলোর সঙ্গে কোনোই মিল নেই এ ঈদের। করোনা ভাইরাস মহামারির পটভূমিতে বদলে যাওয়া দুনিয়ার অন্য অনেক দেশের মতোই আমেরিকাজুড়েও জনজীবনের ওপর চলছে নানা রকম বিধিনিষেধ। সেসবের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা বা বড় ধরণের গণজমায়েত না করা। সে কারণে এবারের ঈদে নিউ ইয়র্কে বড় রকমের কোনো ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। এছাড়া মহামারির ছোবলে গত দুই মাসে নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশী কমিউনিটির প্রায় ২৫০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই এখানকার মুসলমানদের মধ্যে উৎসবের তেমন কোনো আমেজ নেই।

চোখে পড়ার মতো ঈদের কোনো আয়োজন বা চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না কোথাও। অবশ্য দুর্যোগের মধ্যেও ঈদ উপলক্ষে নিউ ইয়র্কের মুসলমানদের ঘরে ঘরে সামর্থ অনুযায়ী যথারীতিই মজাদার খাবার-দাবার তৈরী হচ্ছে।
এছাড়া কর্তৃপক্ষের বেঁধে দেয়া নিয়মের মধ্যে থেকে সর্বোচ্চ ১০ জনের অংশগ্রহণে ঈদ-জামাত আয়োজনের সুযোগ রয়েছে। সে অনুযায়ী কিছু কিছু স্থানে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও মসজিদ কমিটির সদস্যদের অংশগ্রহণে ছোট ছোট জামাত অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে। সাধারণ মুসল্লীদেরকে এসব জামাতে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের না হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বরং প্রত্যেককে তাদের নিজনিজ ঘরে যথানিয়মে ঈদের নামাজ আদায় করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী নিউ ইয়র্ক সিটিতে কমবেশি প্রায় ৮ লাখ মুসলমানের বসবাস, যা আমেরিকায় বসবাসকারী মোট মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ। এরমধ্যে একক দেশ হিসাবে বাংলাদেশী মুসলমানের সংখ্যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যদিও ঠিক কতসংখ্যক বাংলাদেশী নিউ ইয়র্ক সিটিতে বসবাস করেন তার নির্ভরযোগ্য কোনো হিসাব পাওয়া যায় না। তবে এই সংখ্যা এক লাখের কম নয় বলেই মনে করা হয়। সিটিতে কুইন্স বোরোর এস্টোরিয়া, জ্যাকসন হাইটস, উডসাইড, এলমহার্স্ট, জ্যামাইকা, কুইন্স ভিলেজ, হলিস ও ওজনপার্ক, ব্রুকলিনের চার্চ-ম্যাকডোনাল্ডস, ফ্লাটবুশ ও ফুলটন স্ট্রিট, ব্রোঙ্কস বোরোর পার্কচেস্টার ও স্টার্লিং প্লেস এবং ম্যানহাটন ও স্ট্যাটেন আইল্যান্ড বোরোর কয়েকটি স্থানে বাংলাদেশীদের পরিচালিত অনেকগুলো মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার রয়েছে। প্রত্যেক ঈদুল ফিতর ঈদুল আজহায় এসব মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারের উদ্যোগে বিভিন্ন খোলা জায়গায় পৃথক পৃথকভাবে বর্ণাঢ্য আয়োজনে ঈদের জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় জামাতটি অনুষ্ঠিত হয় জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের উদ্যোগে। ওই একটি জামাতেই কমবেশি ১০ হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করে থাকে। কিন্তু এই ঈদে সে রকম কোনো আয়োজন সম্ভব হচ্ছে না। যদিও ঈদ উপলক্ষে গত কয়েকদিন ধরে নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশী মালিকানাধীন গ্রোসারী দোকানগুলো বেশ জমজমাট ছিল। সামাজিক দূরত্বের নিয়মত মেনেই ক্রেতারা ঈদ উপলক্ষে বিশেষ কেনাকাটা করেছেন।
মানবজমিন প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে জ্যাকসন হাইটসের বাসিন্দা ও জ্যাকসন হাইটস বাংলাদেশী বিজনেস এসোসিয়েশনের (জেবিবিএ) নেতা মাহমুদ হোসাইন বাদশা বলেন, বিগত অনেক বছর ধরে জ্যাকসন হাইটসে চাঁদরাতে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য তৈরী হতো। পুরো নিউ ইয়র্ক সিটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার বাংলাদেশী ঈদের আগের সন্ধ্যায় জড়ো হতেন এখানে। হাতে মেহেদী লাগানো থেকে শুরু করে নানা আয়োজনে গভীর রাত অবধি উৎসবমূখর থাকতো জ্যাকসন হাইটস। কিন্তু এবারের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। বিকাল পর্যন্ত গ্রোসারী দোকানগুলোতে ক্রেতাদের কিছুটা ভিড় থাকলেও সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা ধীরে ধীরে খালি হতে থাকে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একেবারে ভূতুড়ে এলাকায় পরিণত হয় জ্যাকসন হাইটস। এই দৃশ্যের সঙ্গে আমরা একেবারেই পরিচিত। খুবই মন খারাপ করা দৃশ্য এটি। কিন্তু কিছুই করার নেই। গোটা দুনিয়াই তো এখন এক অচেনা বিপদের মুখে। আমাদেরও তাই এ পরিণতি মেনে নিয়ে সরকারি বিধি-নিষেধের মধ্যে থেকে ঘরের ভিতরে ঈদ উদযাপন করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাছাড়া ভয়ংকর এই দুর্যোগে গত দুই মাসে আমাদের অনেক কাছের মানুষ এবং কমিউনিটির অনেক পরিচিতজনকে হারিয়েছি। বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি কামাল আহমেদ, যুগ্ম সম্পাদক আজাদ বাকিরসহ নেতৃস্থানীয় অনেকেই বিদায় নিয়েছেন করোনা ভাইরাসের থাবায়। এসব কারণে আগের বছরগুলোর মতো উৎসবের পরিবেশও এবার নেই।
নিউ ইয়র্কের বিশিষ্ট বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ও ওজন পার্কের বাসিন্দা গিয়াস আহমেদ বেলাল মানবজমিনকে বলেন, আমরা বড় একটি পরিবার। চার ভাই পরিবার-পরিজন নিয়ে একই ক্যাম্পাসে পাশাপাশি আলাদা বাড়িতে থাকি। আগে সব সময় ঈদের দিন সবাই একসঙ্গে বের হয়ে ঈদগাহে গিয়ে নামাজ আদায় করতাম। কিন্তু এবার তো তা হচ্ছে না। তবে অন্যদের চেয়ে আমাদের একটু বাড়তি সুবিধা আছে। আমরা পরিবারের সবাই মিলে ১৫/১৬ জনের একটি জামাত করতে পারবো। বাড়ির আঙ্গিনাতেই হবে সেই ঈদের জামায়াত। অবশ্য এবারের ঈদে অন্য কারণেও আমাদের পরিবারে শূন্যতা বিরাজ করছে। কারণ, রোজার কয়েকদিন আগেই আমাদের পিতা ৯৪ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আগের প্রতিটি ঈদে তাঁকে নিয়েই আমরা ঈদের নামাজ পড়তে যেতাম। তাই ঈদের দিন সামনে রেখে মনটা বেশ ভারাক্রান্ত।