নিউ নরমাল

279

একটা ভাইরাস। ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বে। দেশে দেশে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। ঠিক মতো কিছু বুঝে উঠার আগেই মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ভাইরাসে, শরীর অসুস্থ হচ্ছে এবং মারাও যাচ্ছে। করোনাভাইরাস এখন এক আতঙ্কের নাম। এখনও অবধি নিশ্চিত করে এর প্রতিকার বা ওষুধের খোঁজ মেলেনি। তাই চেষ্টা করা হচ্ছে মানুষকে যতটা পারা যায় ঘরে আটকে রেখে রোগ থেকে দূরে রাখতে। যার অর্থ আছে, যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম চিকিৎসা চোখে পলকে কিনে নিতে পারেন, তিনিও আজ অসহায়।

করোনা ভাইরাস কিছু বিষয় পরিষ্কার করল আমাদের কাছে। সামাজিক ক্ষমতার কাঠামো ভেঙ্গে পড়েছে, অর্থ আর নিরাপত্তার প্রতীক বা নিশ্চয়তা নয়, উৎসব করতে হবে মানুষের মিলন ছাড়াই। আমরা সবাই জানি উৎসব দু:খকে ছেড়ে সুখকে আলিঙ্গন করে, উদাসীনতাকে ছেড়ে উচ্ছলতাকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু এখন উৎসবেও মন উদাসীন। এখন আর সেই সব আবেগ নেই। একে বলা হচ্ছে নিউ নরমাল বা নতুন স্বাভাবিকতা। বিমান চলাচল বন্ধ, দেশে দেশে নিষিদ্ধ পর্যটক প্রবেশ। বিশ্বব্যাপী সব ঐতিহ্যবাহী ফেস্টিভ্যাল বা উৎসব স্থগিত। আজ ঈদ, বাংলাদেশ সহ বিশ্বের সব মুসলিম দেশে ঈদের জন্য মানুষের যে মিষ্টি মতো প্রতীক্ষা থাকে সেটা এবার ছিল না এবং আবার কবে সেই সময় আসবে কারও জানা নেই। একটি নিজস্ব কঠোরতা আমাদের মাঝে যারা এই ভয়ংকর ছোঁয়াচে রোগ সম্পর্কে জানে। তারা নিজেদের বন্দী করছে ঘরের ভেতর। এ যেন স্ব-ঘোষিত কার্ফ্যু। যে ইউরোপ, যে আমেরিকা বা কানাডা, যে জাপান নতুন নতুন সব জাগরণে উদ্দীপ্ত থাকে সব সময় সেসব দেশ এখন আতঙ্কের প্রহর গুনছে।

করোনা-কাঁটায় সঙ্গীন অবস্থা বিশ্ব অর্থনীতির। আমরা আমাদের স্বাভাবিক কাজ করতে পারছি না। এ শুধু অফিস বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ নয়। রেস্তোঁরা বন্ধ, চুল কাটার দোকানে তালা, দাঁতের ডাক্তারের কাছে যাওয়া সম্ভব হচ্ছেনা। সংক্রমণ রুখতে প্রতিটি দেশ শুরু থেকেই স্কুল-কলেজ, সিনেমা হল, শপিং মল, রেস্তোরাঁ-পানশালা সব বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। এটিই এখন নতুন স্বাভাবিকতা। সবার মাঝে অনিশ্চয়তা আর উৎকন্ঠা। ঘরে থাকতে থাকতে শারীরিক, মানসিক সব রোগ ঘিরে ধরছে আমাদের, চিকিৎসা পাওয়ার উপায় সীমিত, কারণ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা ব্যস্ত করোনা রোগী নিয়ে।

আর্থিক অবস্থা ভেঙ্গে পড়ছে। বলা হচ্ছে সারা বিশ্বের ৮১ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষ কাজ হারাবে। যারা ব্যাক্তিখাতে কাজ করতো, তাদের অনেকেরই রোজগার বন্ধ, সঞ্চয় শেষ হয়ে আসছে। ঘরবন্দী মানুষ ভুগছে অনিশ্চয়তায়, তারা আজ ভীত তাদের আগামী নিয়ে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে রাখতে নিজেদের অপ্রকৃতস্থ মনে হলেও মনে করতে হবে এটাই স্বাভাবিকতা। বিচ্ছিন্নতা, তবুও নৈকট্যের কথা বলছে করোনা ভাইরাস সময়ের পৃথিবী। সামাজিক আর শারীরিক দূরত্ব নাগরিক মনে নতুন এক বিচ্ছিন্নতা জন্ম দিয়েছে। ঘরে আটকে আছি, কিন্তু আমরা একা। যেন আমরা প্রত্যেকে সব থেকেও একা৷ এখন আমাদের জানতে হচ্ছে দূরে থেকেও সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা যায় কি করে। করোনায় ঘরবন্দী থেকে থেকে বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি প্রবীণদের আর শিশুদের। তাদের কথা আরও অন্তর দিয়ে ভাববার সুযোগ করে দিল এই ভাইরাস। ভয় মানুষকে, ভয় জনসমাবেশকে। আর তাই ভাবনা – মহামারির সময়ে প্রেম-ভালবাসার সম্পর্ক অটুট থাকছে তো? না কি অনেক কিছুর মতোই তাতে পরিবর্তন আসছে? কারণ, মৃত্যুভয় বা অস্তিত্ব সঙ্কটের এমন সর্বজনীন পরীক্ষায় আগে বসতে হয়নি মানুষকে। এই পরীক্ষা দেয়াটাই নিউ নরমাল, নতুন স্বাভাবিকতা।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, লেখক: সাংবাদিক