৭৮ দিন পর আজ জাগছে নিউ ইয়র্ক

70

দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা জেগে থাকার শহর এটি। বহুকালের নির্ঘুম এই শহর হঠাৎই ঘুমিয়ে পড়েছিল ৭৮দিন আগে। একেবারে গভীর ঘুমে যেতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু আর কত? তাবত দুনিয়া তাকিয়ে থাকে যে শহরের দিকে সেই শহর না জাগলে কি করে চলবে? দুনিয়ার রাজধানীখ্যাত নিউ ইয়র্কের ঘুম অবশেষে ভাঙছে আজ সোমবার। মাত্র আড়াই মাসে প্রায় ২০ হাজার মানুষের মৃত্যুর স্মৃতি নিয়ে নতুনভাবে জেগে উঠছে কোটি মানুষের নগরী নিউ ইয়র্ক। তবে একবারে সবকিছু নয়। ধাপে ধাপে খুলে দেয়া হবে সবকিছু। আজ প্রথমদিন খুলে দেয়া হচ্ছে কনস্ট্রাকশন, ম্যানুফ্যাকচারিং, খুচরা বেচাকেনা এবং খুচরা দোকানগুলোতে পাইকারদের ডেলিভারি কার্যক্রম।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই সামাজিক দূরত্বের বিধিনিষেধ এবং ফেসমাস্ক পরার বাধ্যবাধকতা শক্তভাবে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে নয়, ফেরা হচ্ছে নতুন এক স্বাভাবিক জীবন বা “ নিউ নরম্যাল লাইফে”।
করোনা মহামারির থাবায় দুনিয়ার অন্যতম প্রধান নগরী নিউ ইয়র্ক ধীরে ধীরে প্রাণহীন হতে শুরু করে মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই। তবে সরকারিভাবে “স্টে ইন হোম” আদেশের আওতায় আনুষ্ঠানিকভাবে লকডাউনে চলে যায় আটলান্টিক তীরের এই নগরী। বন্ধ হয়ে যায় স্কুল-কলেজসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শপিং মল ইত্যাদি। অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে বিস্তার ঘটতে থাকে করোনা সংক্রমণের। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই নিউ ইয়র্ক হয়ে উঠে করোনা ভাইরাসের অন্যতম ইপিসেন্টার বা কেন্দ্রস্থল। গতকাল রোববার পর্যন্ত শুধুমাত্র নিউ ইয়র্ক স্টেটেই আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৪ লাখ মানুষ। আর মৃত্যু হয় ৩০ হাজারেরও বেশি। এরমধ্যে কেবল নিউ ইয়র্ক সিটিতেই মারা যায় প্রায় ২০ হাজার মানুষ। এই শহরেই প্রাণ হারিয়েছেন আড়াই শতাধিক বাংলাদেশী।
ঝড়ো গতিতে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং চারদিকে অগণিত মৃত্যু সংবাদে নিউ ইয়র্ক হয়ে ওঠে এক বিষাদের নগরী। ভয়ংকর আতঙ্ক গ্রাস করে নগরীর বাসিন্দাদের। সে কারণে সরকারি বিধিনিষেধের চেয়েও জীবন বাঁচানোর তাগিদেই স্বেচ্ছায় ঘরবন্দী হয়ে পড়েন এখানকার লাখ লাখ মানুষ।কেবলমাত্র এশেনশিয়াল (অত্যাবশ্যকীয়) সার্ভিসের কর্মীরা ছাড়া আর কেউই মহাবিপদে না পড়লে ঘর থেকে বের হওয়ার ঝুঁকি নেননি। এভাবে সরকারি জবরদস্তি ছাড়াই নগরজুড়ে নেমে আসে এক কঠোর লকডাউন। দীর্ঘকালের কোলাহলমূখর নিউ ইয়র্ক হয়ে পড়ে একেবারে অচেনা। আর এভাবেই ধীরে ধীরে লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয় করোনা মহামারির। এপ্রিল মাসের দ্বিতায়র্ধেই কমতে শুরু করে নতুন সংক্রমণের হার। তারপর ক্রমশে কমতে থাকে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা এবং এক পর্যায়ে কমে যায় মৃত্যুহারও।
নিউ ইয়র্ক এখনও করোনার প্রাদুর্ভাবমুক্ত হয়নি। তবে কর্তৃপক্ষ মনে করছে যে, পরিস্থিতি এখন অনেকটাই তাদের নিয়ন্ত্রণে। নতুন সংক্রমণ, হাসপতালে ভর্তি এবং মৃত্যুহার ব্যাপকভাবে কমে আসার পাশাপাশি বৃদ্ধি করা হয়েছে করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা এবং এন্টিবডি টেস্টের কার্যক্রম। নিউ ইয়র্ক স্টেটে গত শুক্রবার একদিনেই সর্বোচ্চ প্রায় ৭৮ হাজার মানুষের করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এরমধ্যে পজিটিভ হয়েছেন মাত্র ১ হাজার ১শ’ ব্যাক্তি। অথচ এপ্রিল মাসের গোড়ার দিকেও দৈনিক যত মানুষের করোনা পরীক্ষা করা হতো তারমধ্যে অর্ধেকেরই রেজাল্ট হতো পজিটিভ। শুক্রবার নিউ ইয়র্কের হাসপাতালগুলোতে মাত্র ৭২ জন করোনা আক্রান্ত নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন।নতুন করে করোনা’র বিস্তার রোধে নিউ ইয়র্কের স্টেট সরকার এখানকার প্রতিটি মানুষকে টেস্টের আওতায় নিয়ে আসার পদক্ষেপ নিয়েছে। যাদের এরইমধ্যে করোনা সংক্রমণ হয়েছে তাদের করা হচ্ছে এন্টিবডি টেস্ট। আর যাদের কোনো লক্ষন দেখা দেয়নি তাদের করা হচ্ছে করোনা টেস্ট। মানুষকে টেস্টে উৎসাহিত করতে প্রতিটি নেইবারহুডেই পরীক্ষা কার্যক্রমের সুবিধা বিস্তৃত করা হয়েছে। খুব সহজেই যে কোনো আর্জেন্ট কেয়ার ক্লিনিকে গিয়ে কার্যত বিনামূল্যে স্বাস্থ্যবীমার কার্ড দেখিয়েই এ পরীক্ষা করানো যাচ্ছে।
করোনা ভাইরাসের অকল্পনীয় আগ্রাসি থাবা, বহু মানুষের মৃত্যুর স্মৃতি এবং জর্জ ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদে চলমান আন্দোলন-সংগ্রমের মধ্যেই আজ সোমবার নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছে নিউ ইয়র্কের মানুষ। এক ধরণের আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা নিয়েই কাজে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এখানকার বাসিন্দারা। বাংলাদেশী-আমেরিকান ব্যবসায়ী, বি এ্যান্ড পারফিউম কোম্পানির অন্যতম কর্ণধার গিয়াস আহমেদ বেলাল বলেন, এক ভয়ংকর মৃত্যু-ঝড়ের মধ্যে এখনও যে বেঁচে আছি এটাই এই মুহুর্তের সবচেয়ে বড় ব্যাপার। এই মহামারিতে নিজের ৯৪ বছর বয়েসী বাবাকে হারিয়েছি। আরও অনেক স্বজন, চেনা মানুষও চলে গেছেন আমাদের ছেড়ে। মনজুড়ে স্বজন হারানোর দগদগে ক্ষত। তবুও জীবন তো থেমে থাকে না। সরকারি বিধি-নিষেধ মেনেই নতুন এক স্বাভাবিক জীবনে পা রাখার চেষ্টা করবো আজ। অফিস এবং বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান খুলবো। ব্যবসা হোক বা না হোক, এই ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা তো করতেই হবে। আমি একা নই, সবাইকে, পুরো নিউ ইয়র্ক নগরীকেই বদলে যেতে হবে। পথ চলা শুরু করতে হবে নতুন রূপে। এটাই বাস্তবতা। পুরোপুরি আগের জীবন ফিরে পাওয়ার চিন্তা করে তো এখন লাভ নেই। নতুন স্বাভাবিক জীবন বা নিউ নরম্যাল লাইফে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টাই করতে হবে।