সরকারি নির্দেশনার পরও করোনা চিকিৎসায় অনীহা

76

৫০ শয্যার উপরের সবক’টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল তিন সপ্তাহ আগে। এই তিন সপ্তাহে কতোটা প্রস্তুত হয়েছে হাসপাতালগুলো। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, করোনা চিকিৎসায় ডেডিকেটেড হাসপাতাল ছাড়া অন্য হাসপাতালগুলো করোনা চিকিৎসায় অনীহা দেখাচ্ছে। কিছু হাসপাতাল প্রস্তুতি নিলেও স্বল্প সংখ্যক রোগী ভর্তি করছে। এ কারণে দিন দিন রোগী বাড়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে।

শুধু যে করোনা রোগী চিকিৎসা পাচ্ছেন না তা কিন্তু নয়। সাধারণ সর্দি, কাশিসহ অন্যান্য রোগীরা ফিরে যাচ্ছেন হাসপাতাল থেকে। সরকারদলীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে শুরু করে চিকিৎসক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরে চিকিৎসা পাচ্ছেন না। কিছু কিছু হাসপাতালে সিট ও আইসিইউ সংকট দেখিয়ে রোগী ভর্তি নেয়া হয় না।

চিকিৎসা না পেয়ে গত কয়েক দিনেই বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে।

গত ২৪ শে মে দেশের ৫০ শয্যার উপরে সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসার নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ওইদিন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সিরাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিকে কোভিড ও নন-কোভিড রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের নির্দেশ দেয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দেশের কোভিড-১৯ চিকিৎসা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে একই হাসপাতালে কোভিড ও নন-কোভিড রোগীদের আলাদাভাবে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার পরামর্শ প্রদান করেছেন। এমতাবস্থায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রস্তাব মতে ৫০ শয্যা বা তার বেশি শয্যাবিশিষ্ট সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে কোভিড এবং নন-কোভিড রোগীদের চিকিৎসার জন্য পৃথক ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেয়া হলো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার সরকারি বড় হাসপাতালগুলোর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক), মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে এখনও করোনা ইউনিট চালু করা হয়নি। হাসপাতালটির পরিচালকের তরফ থেকে জানানো হয়েছিলো করোনা চিকিৎসার জন্য একটি ইউনিট চালু করা হচ্ছে।

গতকাল পরিচয় গোপন করে রোগীর স্বজন সেজে যোগাযোগ করা হয় ঢাকার নামি অন্তত এক ডজন হাসপাতালে। এদের মধ্যে বেশ কিছু হাসপাতাল এখনও করোনা রোগীদের সেবা দেয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। আরো কিছু হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি নেয়া হয় এমন দাবি করে সিট সংকটের অজুহাত দেখানো হয়। রোগীর স্বজন সেজে ঢাকার পান্থপথের একটি হাসপাতালের হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করলে সেখান থেকে একজন বলেন, আমরা করোনা রোগী ভর্তি নিচ্ছি না। সরকার থেকে অনুমতি দেয়া হয়নি। অনেক অনুরোধ করে রোগী ভর্তির কথা জানালে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।

ইবনে সিনা হাসপাতালের একজন কল সেন্টার প্রতিনিধি জানান, তাদের হাসপাতালে শুধুমাত্র করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। রোগী ভর্তি করা হয় না। সিটি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সেখান থেকে জানানো হয় এই হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি করা হয় না এমনকি টেস্টও করা হয় না। ডেলটা হাসপাতাল হেল্প ডেস্ক থেকে বলা হয়, এখানে করোনার কোনো চিকিৎসা দেয়া হয়না। হলি ফ্যামেলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে করোনা রোগীর চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তবে সীমিত পরিসর হওয়ায় ভর্তির আগে প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

করোনার চিকিৎসার বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কিছু হাসপাতাল সিট সঙ্কটের অজুহাত দেখিয়ে অপারগতা প্রকাশ করে। আজগর আলী হাসপাতালে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি নেয়া হয় তবে এখন কোন আসন খালি নেই। যোগাযোগ রাখলে পরবর্তীতে পাওয়া যেতে পারে। রাজধানীর গ্রিন রোডের দুটি নামি হাসপাতালে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, এই মুহূর্তে করোনা রোগী ভর্তির মতো কোন আসন খালি নেই তাদের।

এদিকে ঢাকার বাইরের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিত্রও প্রায় একই। করোনা ও করোনার উপসর্গ আছে এমন অনেক রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠছে। পহেলা জুলাই সিলেটের ছয় হাসপাতাল ঘুরে বিনা চিকিৎসায় মারা যান ৭০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা। স্ট্রোকের এই রোগীকে শ্রীমঙ্গল থেকে প্রথমে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে আইসিইউ সাপোর্ট না থাকায় নেয়া হয় নর্থইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে ভর্তি না নিলে একে একে নগরীর আল হারামাইন হাসপাতাল, ইবনেসিনা হাসপাতাল, মাউন্ট এডোরা হাসপাতাল, সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও নূরজাহান হাসপাতালে নেয়া হয়। কোথাও মিলেনি চিকিৎসা। পরে রাত দেড়টার দিকে তাকে ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এর দুদিন আগে মনোয়ারা বেগম নামের আরেক নারীকে সিলেটের একের পর এক হাসপাতাল ঘুরে ভর্তি করাতে না পেরে এম্বুলেন্সেই মৃত্যু হয়। এদিকে ঢাকায় মাথায় আঘাত পেয়ে রক্তক্ষরণ নিয়ে ৬ হাসপাতাল ঘুরে বিনা চিকিৎসায় ৪ঠা জুন মৃত্যুবরণ করেন হাজী মো. এনায়েত উল্লাহ নামের ৭২ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ। এনায়েত উল্লাহর ছেলে জানান, ওইদিন সকালে তার বাবা অসুস্থতাবোধ করলে প্রথমে বরপার ইউএস বাংলা হাসপাতাল, ডেমরার সানারপাড়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতালসহ মোট ছয়টি হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা মিলেনি। সন্তানদের চোখের সামনে বিনা চিকিৎসায় ওই বৃদ্ধ মারা যান। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা জারির পাশাপাশি বলা হয়েছিল হাসপাতালে রোগী আসলে যদি ফিরিয়ে দেয়া হয় তাহলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রয়োজনে হাসপাতালের অনুমতিপত্র বাতিল করা হবে। তবে এ পর্যন্ত কোন হাসপাতালের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোন শাস্তি প্রয়োগের তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) নাসিমা সুলতানা মানবজমিনকে বলেন, হাসপাতালগুলোতে আমাদের নির্দেশনা দেয়া আছে। আমরা খোঁজখবর নেব। আর যারা নির্দেশনা পালন করছে না তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে।