বন্যা ও নদী ভাঙনে যমুনা চরাঞ্চলে নেই ঈদ আনন্দ

113

ভাইরে জ্ঞান হবার পর থেকেই দেখছি নদী ভাঙনের সঙ্গে যুদ্ধ করছে আমাদের বাপ-দাদারা। আমরা বৃদ্ধ হইলাম এখনও যমুনার ভাঙন আমাদের পিছু ছাড়েনি। এবার আবার দেশে এসেছে করোনা, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়াবহ বন্যা। সব মিলিয়ে আমাদের চরাঞ্চলের মানুষের ভালো থাকার স্বপ্নভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে।

কথাগুলো এভাবেই বললেন সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের ঘুশুরিয়া চরের কামরুল, হিজুলিয়া চরের বাশিরুল ও উমারপুরের পয়লা গ্রামের আইয়ুব আলী।

তারা পেশায় কৃষক। এবার বন্যার প্রথম দিকে বাশিরুল ও আইয়ুব আলীর ক্ষেতের বাদাম তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এ কারণে অনেক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। এছাড়া এবছর নদী ভাঙনে কামরুলের বসত ভিটা যমুনায় চলে গেছে। এজন্য এ পরিবারে এবার নেই ঈদের আনন্দ।

গত বছর কোরবানি দিতে পারলেও এবছর ৩ জনের কেউই কোরবানি দিতে পারছেন না।

জানা যায়, যমুনা নদী ভাঙনে বিপর্যস্ত মানুষ করোনা ও বন্যার কারণে নিদারুন কষ্টে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

বিশেষ করে যমুনা চরাঞ্চলের প্রায় এক হাজার পরিবারে নেই ঈদ ও কোরবানির আনন্দ। যমুনার দু’পাড়ের বহু পরিবার বন্যা ও নদী ভাঙনে বসত-ভিটে হারিয়ে নিজেদের একটু মাথা গোঁজার ঠাই খুঁজতেই ব্যাস্ত। তাদের পরিবারের ছোট সন্তানদের নতুন জামা কিনে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না, আর পশু কিনে কোরবানি দেয়াতো এখন স্বপ্নের মত।

চৌহালীর উপজেলার দক্ষিণে খাষপুখুরিয়া, বাঘুটিয়া, মিটুয়ানী, দেওয়ানগঞ্জ বাজার, চরছলিমাবাদ, বোয়ালকান্দি ও এনায়েতপুর থানা সদরের ব্রাহ্মনগ্রাম, আড়কান্দিচর, বাঐখোলা, জালালপুর ছিল একটি সমৃদ্ধ জনপদ ছিল।

চরের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ছিল গবাদি পশু পালন, কৃষি ও তাঁত শিল্পের ব্যবসা করে তারা জীবিকা নির্বাহ করতেন বংশানুক্রমে। কিন্তু বিগত ৫ বছর ধরে যমুনা নদীর রাক্ষুসী থাবায় একে একে বিলীন হতে থাকে এসব এলাকার বহু ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে এ বছরের বন্যা ও গত দেড়মাস ধরে যমুনা নদীতে প্রচণ্ড স্রোতে ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি হয়ে যমুনার পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে চলে ভাঙনের তাণ্ডবলীলা।

সরেজমিন দেখা জানা গেছে, ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে চৌহালী ও এনায়েতপুর থানার প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক বসত ভিটা, ঈদগাহসহ ৭টি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। তলিয়ে যায় কয়েক হাজার একর আবাদি জমি। একারণে এসব এলাকায় চলে বন্যা ও নদী ভাঙনে বিধ্বস্তদের আহাজারি ও সাহায্য প্রার্থনা। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার গুলোর জন্য ভিজিএফ চালের বরাদ্দ দিলেও কতিপয় জনপ্রতিনিধি দুস্থদের চাল নিয়ে চালবাজি করায় অনেক পরিবার ত্রাণ সহায়তা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। এছাড়া করোনার কারণে কর্মীহীন পরিবারে মধ্যে খাবারের অভাবসহ কাজ না থাকায় নিদারুন কষ্টে থাকা পরিবারে ঈদের আনন্দ থাকছে না বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

এ বিষয়ে আড়কান্দি চরের জলিল মিয়া, বরকত আলী ও সুন্দরী খাতুন জানান, বন্যার সঙ্গে নদী ভাঙন যুক্ত হয়ে তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়ে গেছে। প্রতি বছরের মত ইচ্ছা ছিল গবাদি পশু কোরবানি দেয়া। কিন্তু নদী ভাঙনে সব হাড়িয়ে এখন তারা পথে বসার উপক্রম।

চৌহালীর বাঘুটিয়া ইউনিয়নের হাটাইল চরের মোকদম আলী জানান, সারা দেশে ঈদের আমেজ লাগলেও তার পরিবারে এখনো ঈদের কোন আমেজ নেই। ছোট সন্তানদের কিনে দিতে পারিনি নতুন পোশাক।

চৌহালী উপজেলার বাঘুটিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল কাহহার সিদ্দিকী যুগান্তরকে জানান, একদিকে করোনা সঙ্গে বন্য ও তীব্র নদী ভাঙনে অসহায় পরিবারগুলোতে আসলেই ঈদের তেমন আমেজ নেই। বিশেষ করে চরের মানুষগুলো এবারের ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ভাঙন ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোর মাঝে জিআর ও ভিজিএফ চাল বিতরণ করা হয়েছে।