তাইওয়ানে চীন হামলা চালালে কী করবে যুক্তরাষ্ট্র

134

চীন কী তাইওয়ান দখলে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে? অনেক চীনা ফোরামে এখন এই প্রশ্ন নিয়ে তীব্র আলোচনা আর তর্ক-বিতর্ক চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যিনিই বিজয়ী হোন না কেন, তার সামনে সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক মাথাব্যাথা হয়ে দাঁড়াতে পারে এই তাইওয়ান ইস্যু।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গত ১৩ অক্টোবর দক্ষিণ গুয়াংডং প্রদেশে পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) একটি ঘাঁটি পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি তার বক্তব্যে মেরিন সেনাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেন। এরপর অনেক সংবাদপত্রের শিরোনামে এরকম একটা ইঙ্গিত ছিল তাইওয়ানের বিরুদ্ধে চীনের অভিযান অত্যাসন্ন।

কিন্তু এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় এরকম কিছু সহসা ঘটছে না। তবে চীন বিশেষজ্ঞরা কেন তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ নিয়ে এত জরুরি আলোচনায় মেতেছেন তার কিছু কারণ আছে।

তবে তাইওয়ান নিয়ে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই মুখোমুখি অবস্থান অনেক দীর্ঘ দিনের। চীন দাবি করে দুই কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার এই দেশটি তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তবে ওয়াশিংটন মনে করে চীন আর তাইওয়ানের যে দীর্ঘ বিচ্ছেদ তা মীমাংসা হতে হবে শান্তিপূর্ণভাবে। তাইওয়ান নিয়ে চীন আর যুক্তরাষ্ট্রের এই অচলাবস্থা চলছে দশকের পর দশক ধরে। কিন্তু মনে হচ্ছে এই অচলাবস্থা যেন এখন ভঙ্গ হতে চলেছে।

তাইওয়ান প্রশ্নে এতদিনের এই স্থিতাবস্থা কেন আর টিকবে না বলে মনে হচ্ছে, তার কিছু কারণ আছে। এর প্রথম কারণটাই হচ্ছেন শি জিনপিং। তবে লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজের চায়না ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক স্টিভ সাং বলছেন, `জিনপিং তাইওয়ানকে ফেরত চান আর শি জিনপিং তাইওয়ানকে ফিরে পাওয়ার এই কাজটা শেষ করতে চান, চীনের পরবর্তী নেতা যিনিই হবেন, তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে।’

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন বিষয়ক এক সামরিক বিশ্লেষক বলছেন, শি জিনপিং যখন ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্টের মেয়াদকালের সময়সীমা তুলে দিয়ে কার্যত নিজেকে আজীবনের জন্য প্রেসিডেন্ট বানালেন, তখনই তার মনে এরকম একটা আশঙ্কা তৈরি হয়। হঠাৎ করেই তাইওয়ান সম্পর্কে তিনি যেটাই বলছিলেন, তার একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ দাঁড়াচ্ছিল। তিনি কখন এই সমস্যার সমাধান চান সেটা কিন্তু এখন নেতা হিসেবে তার বৈধতা ও মেয়াদের বৈধতার প্রশ্নের সাথে জড়িয়ে গেছে।

অধ্যাপক স্টিভ সাংয়ের মতে, শি জিনপিং নিজেকে এক বিরাট ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব বলে মনে করেন। তিনি মনে করেন মাও জেদং থেকে শুরু করে চীনের আগের অনেক বড় বড় নেতা যে কাজ শেষ করতে পারেননি, সেটি শেষ করার দায়িত্ব তার কাঁধে বর্তেছে। তাকেই এটা করতে হবে।

তিনি বলেন, দেং শিয়াওপিং তাইওয়ানকে ফিরিয়ে আনতে পারেননি। এমনকি চেয়ারম্যান মাও পর্যন্ত পারেননি। এখন যদি শিজিনপিং তাইওয়ানকে চীনের কাছে নিয়ে আসতে পারেন তিনি কেবল দেং শিয়াওপিংয়ের চাইতে বড় নেতা হবেন না, তিনি চেয়ারম্যান মাওয়ের চেয়েও বড় নেতায় পরিণত হবেন।

শি জিনপিং এর আগে প্রকাশ্যে বলেছেন, তাইওয়ানকে চীনের সাথে এক করার বিষয়টি চীনের মানুষকে দারুণভাবে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য এক অবশ্যম্ভাবী প্রয়োজনীয় কাজ। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চীনা জনগণের যে বিরাট পুনরুজ্জীবনের কথা বলছেন তার সেই পরিকল্পনার সময়সীমা ২০৪৯ সাল। যে বছর আসলে চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবের শতবর্ষপূর্তি। কিন্তু কিন্তু তার তো এখনো ৩০ বছর দেরি।

এই পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে।
চীন এই সুযোগে ফিলিপাইনের উপকূলে দক্ষিণ চীন সাগরে স্ক্যারবারো দ্বীপগুচ্ছের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। দক্ষিণ চীন সমুদ্রে যখন চীন একের পর এক কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে সেখানে ঘাঁটি বানিয়েছে তখনো যুক্তরাষ্ট্র কিছু করেনি। ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত স্ক্যারবারো দ্বীপে যা ঘটেছে সেটিকে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বড় ব্যর্থতা বলে মনে করছেন।

তিনি আরো বলেন, `আমি বলবো ১৯৭৫ সালে সায়গনে আমাদের দূতাবাস ভবনের ছাদ থেকে হেলিকপ্টারগুলো আকাশে ওড়ার পর স্ক্যারবারো দ্বীপের এসব ঘটনা আসলে এশিয়ায় মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।’ ১৯৭৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সায়গনে তাদের দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং পরিবারের সদস্যদের হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করেছিল। আর এর মাধ্যমে ভিয়েতনাম যুদ্ধের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটেছিল।

ক্যাপ্টেন ফ্যানেল বলেন, ‘এই ঘটনাটা ছিল এক বড় বিপর্যয়। এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে এই ঘটনা। তখন আমরা ফিলিপাইনকে রক্ষায় কিছুই করিনি।’ চীন তাইওয়ানকে ফিরে পেতে চায় কারণ এটিকে তারা তাদের দেশের এক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অংশ বলে মনে করে। তবে এটাই কিন্তু একমাত্র কারণ নয়। তাইওয়ান চীনের নিয়ন্ত্রণে আসলে এটি চীনের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেবে বহুগুণে।

যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের ভাষায়, তাইওয়ান তখন হয়ে উঠবে চীনের জন্য প্রশান্ত মহাসাগরে এমন এক এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার (বিমানবাহী রণতরী) যা কোনো দিনই ডুবানো সম্ভব নয়।

ওরিয়ানা স্কাইলার মাস্ট্রো বলেন, ‘তাইওয়ান নিয়ে যুদ্ধে যদি চীন বিজয়ী হয় সেটি এশিয়া মহাদেশের কৌশলগত মানচিত্র পুরোপুরি বদলে দেবে। যদি তাইওয়ান নিয়ে চীন কোনো যুদ্ধ করে এবং জিতে যায় তবে তারা যে কেবল তাইওয়ানকে চীনের সাথে যুক্ত করবে তা নয় এটি একই সাথে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এখন যে ভূমিকা পালন করে তারও ইতি টানবে। কাজেই চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে তারা অনেক ধরণের সুফল এখানে তুলতে পারবে।’

ওয়াশিংটনে এখন রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট- দুই দলই মোটামুটি স্বীকার করে যে তাইওয়ানের ব্যাপারে হুমকি বাড়ছে। ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি তাইওয়ানের কাছে কয়েক শ’ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির এক চুক্তি অনুমোদন করেছে। এসব সমরাস্ত্রের মধ্যে আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য অত্যাধুনিক ক্ষেপনাস্ত্র পর্যন্ত আছে। এই প্রথম তাইওয়ানকে এরকম সমরাস্ত্র দেয়া হচ্ছে।

তবে এটা এখনো পরিস্কার নয় তাইওয়ান যদি আক্রান্ত হয় তখন যুক্তরাষ্ট্র কী করবে।

ক্যাপ্টেন ফ্যানেল বলেন, ‘এরকম অস্পষ্ট অবস্থান এক বড় ভুল। আমরা ইতিহাস থেকে জানি কুয়েতের সরকারের প্রতি এরকম সমর্থনের অভাব কীভাবে সাদ্দাম হোসেনের কাছে এমন বার্তা দিয়েছিল যে তিনি কুয়েত নিয়ে যা খুশি করতে পারেন। আমরা জানি কোরিয়ান যুদ্ধের সময় কীভাবে চীন আর রাশিয়ার কাছে একই বার্তা গিয়েছিল যে কোরিয়ান উপদ্বীপে হামলা চালানো যায়। আমরা যদি পরিষ্কারভাবে না বলি কারা আমাদের মিত্র এবং তাদের রক্ষায় আমরা কতদূর যাবো তাহলে কিন্তু আমরা তাদের ঝুঁকিতে ফেলে দেব।’

তবে অধ্যাপক সাং বলছেন, অতীতের এসব যুদ্ধ থেকে শিন জিনপিংয়ের শিক্ষা নেয়ার মতো অনেক কিছু আছে। যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার সমর্থনে এগিয়ে এসেছিল। কুয়েতের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে উস্কানি দিয়ে তাদের সংকল্পকে খাটো করে দেখা উচিৎ হবে না চীনের। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কিন্তু লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে খুবই সংকল্পবদ্ধ। যদি চীনারা ওই বিষয়টা বিবেচনায় নেয় তাহলে কিন্তু তারা নিজেদের হিসাব-নিকাষে আরেকটু সতর্ক থাকবে। আর এতে করে ভুল হিসেবের ঝুঁকিও অনেক কমবে।

যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের সম্পর্ক ১৯৮৯ সালের তিয়ানানমেন স্কোয়ারের হত্যাকাণ্ডের পর এখন সবচেয়ে খারাপ। কোভিড-১৯ নিয়ে ক্ষোভ, সন্দেহ বাণিজ্য যুদ্ধ, হুয়াওয়ে নিয়ে তদন্ত, পরস্পরের কনস্যুলেট বন্ধ করে দেয়া ও সাংবাদিকদের বহিস্কার এরকম নানা ঘটনা দু’দেশের সম্পর্কে তিক্ততা বাড়িয়েছে। তবে দু’তরফেই এমন অনেক মানুষ আছেন যারা পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনিই হোন তার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন এই শত্রুতা পরিহার করার জন্য। চীনের সাথে আবার আলোচনায় লিপ্ত হওয়ার জন্য। তবে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন পুরোনো কায়দায় আলোচনায় খুব বেশি ফল পাওয়া যাবে না, সেটা ব্যর্থ হয়েছে।

তাদের মতে, নতুন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে এক নতুন ধরণের কৌশলের কথা ভাবতে হবে। সেটা হতে হবে অনেক বেশি অকপট ও অনেক বলিষ্ঠ। তাইওয়ান এবং এশিয়ার অন্য মিত্রদের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রকে তার বাধ্যবাধকতা ও মনোভাব আরো বেশি স্পষ্ট করে বলতে হবে।

সূত্র : বিবিসি