শোকের মিছিল, অশ্রুর প্লাবন

156

তিনি বিশ্বজয়ী ফুটবলার। বল পায়ে নান্দনিকতার ঝংকারে কয়েকটি প্রজন্মকে মোহিত করে রাখা জাদুকর। আর্জেন্টাইনদের চোখের মণি। নেপলসের রাজা। ফুটবল ইতিহাসের সেরাদের একজন।

ইতিহাস রাঙানো অসংখ্য অর্জন, কীর্তি। প্রতিভা, উন্মাদনা, মাদক, বিতর্ক, দ্রোহ, রোমাঞ্চ আর আবেগ মিলিয়ে দিয়েগো ম্যারাডোনা একজনই।

তার মতো কেউ ছিল না, হয়তো কেউ আসবেও না। বিশ্ব ফুটবল ও ক্রীড়াঙ্গন ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জীবনের চেয়েও বড় এক চরিত্র। গোটা দুনিয়াকে ফুটবলের উথাল প্রেমে মাতানো। সেই মানুষ সবাইকে কাঁদিয়ে আচমকা চলে গেলেন বুধবার।

ম্যারাডোনার মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই কাঁদছে আর্জেন্টিনা, কাঁদছে গোটা ফুটবলবিশ্ব। রাজনীতি ও বিনোদন জগতও শোকে আচ্ছন্ন। ইমরান খান থেকে নরেন্দ্র মোদি, শাহরুখ খান থেকে টম ক্রুজ- ম্যারাডোনার মহাপ্রয়াণ ছুঁয়ে গেছে সবাইকে।

পেলে, মেসি, রোনাল্ডোদের মতোই শোকের সাগরে ভাসছেন উসাইন বোল্ট, রাফায়েল নাদাল, শচীন টেন্ডুলকাররা। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে অন্যলোকে ফুটবল খেলতে চাওয়ার আকুতি করেছে ফুটবল সম্রাট পেলের কণ্ঠে।

ম্যারাডোনা নেই, এই অমোঘ সত্যটা বিশ্বাস হচ্ছে না রোনালদিনহোর। শোকার্ত মেসি এই ভেবে সান্ত্বনা খুঁজছেন যে, চিরন্তন ম্যারাডোনার মৃত্যু নেই।

সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছেন ম্যারাডোনার সহযোদ্ধারা। এক লাইভ অনুষ্ঠানে ‘দিয়েগোর সঙ্গে আমার কত স্মৃতি, কত খুশির মুহূর্ত’ বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন ম্যারাডোনার বিশ্বজয়ের সারথী হোর্হে ভালদানো, ‘আর্জেন্টিনার সবাই তার জন্য কাঁদছে।

যারা ফুটবল ভালোবাসে, তারা তো কাঁদছেই। এমনকি তার বিদায়ে ফুটবলও কাঁদছে।’ ফুটবল রাজপুত্রের আরেক সাবেক সতীর্থ ও আতলেতিকো মাদ্রিদের কোচ দিয়েগো সিমিওনে বলেছেন, ‘আমার কোনো সন্দেহ নেই, বিশ্বের প্রতিটি ফুটবল মাঠে তিনি বেঁচে থাকবেন। তিনি সর্বকালের সেরা ছিলেন, থাকবেন।’

মাদ্রিদের আরেক বিখ্যাত ক্লাব রিয়ালের কোচ ফরাসি কিংবদন্তি জিনেদিন জিদান বলেছেন সবার মনের কথাটা, ‘’৮৬ বিশ্বকাপ আমাদের প্রজন্মের মাথায় গেঁথে আছে। দিয়েগো আমাদের সবার মহানায়ক। আমার কিছু বলার ভাষা নেই। ভীষণ কষ্ট পাচ্ছি।’

ম্যারাডোনার খেলা দেখার সৌভাগ্য হয়নি যাদের, সেই তরুণ প্রজন্মের সেরা ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপ্পেও মুষড়ে পড়েছেন, ‘শান্তিতে থাকুন কিংবদন্তি। ফুটবল ইতিহাসে আজীবন থাকবেন আপনি। সারা বিশ্বকে অপার আনন্দ দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।’

ম্যারাডোনার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বুধবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সব ম্যাচের আগে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। নিজ দলের ম্যাচ শেষে মার্শেই কোচ আন্দ্রে ভিয়াস-বোয়াস আহ্বান জানালেন, ‘ফিফাকে আমি অনুরোধ করব ১০ নম্বর জার্সি স্থায়ীভাবে তুলে রাখা হোক।

এটাই হতে পারে দিয়েগোর প্রতি সম্মান জানানোর সবচেয়ে ভালো উপায়।’ একইভাবে নেপলসের মেয়র ম্যারাডোনার নামে নাপোলির স্টেডিয়ামের নামকরণের প্রস্তাব দিয়েছেন।

নাপোলি অধিনায়ক লরেন্সো ইনসিনিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন ক্লাবের যুগস ষ্টাকে, ‘আপনি আমাদের দিয়েগো। ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়। একজন ভক্ত, একজন নাপোলিতান ও একজন ফুটবলার হিসেবে বলছি, সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ মহানায়ক। সব সময় আপনাকে ভালোবাসব।’

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এক শোকবার্তায় বলেছেন, ‘তার সুন্দর খেলা দেখেই আমরা সবাই ফুটবলের প্রেমে পড়েছি। খেলাটির জন্য ম্যারাডোনা যা করেছেন তা অনন্য। তার মৃত্যু নেই।’

এক বছর আগে আর্জেন্টিনায় দেখা একটি ব্যানারের কথা মনে পড়ছে ম্যানসিটি কোচ পেপ গার্দিওলার, ‘ব্যানারে লেখা ছিল, ‘তোমার জীবনে তুমি কী করেছ তা কোনো ব্যাপার নয় দিয়েগো, গুরুত্বপূর্ণ হল তুমি আমাদের জন্য যা করেছ।’

ম্যারাডোনা আমাদের যা দিয়েছেন তা নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে এ লেখায়।’ ফরাসি কিংবদন্তি মিশেল প্লাতিনির মনে পড়ে যাচ্ছে আশির দশকের সেই সোনালি দিনগুলো, ‘কী একটা সময়ই না আমরা কাটিয়েছি। সোনালি অতীতের সেরা অংশটাই যেন হারিয়ে ফেললাম।’

ব্রাজিলীয় গ্রেট রোনালদোর শ্রদ্ধার্ঘ্য, ‘আমাদের খেলাটি তার অন্যতম সেরা দূতকে হারিয়েছে। আমি হারিয়েছি আমার শৈশবের প্রেরণা ও প্রিয় বন্ধুকে। দিয়েগোর এমন বিদায়ে আমি স্তব্ধ। মাঠে আপনার জাদু চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। শান্তিতে ঘুমান কিংবদন্তি।’