দেশে স্বাস্থ্যবিধি কেউ মানছে কেউ মানছে না

148

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে প্রতিনিয়ত বাড়ছে উদ্বেগ। ক্রমান্বয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের সকল নাগরিকের স্বাস্থ্যবিধি মানাতে ধীরে ধীরে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’- নীতি কঠোরভাবে পালনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ভ্যাকসিন আসার আগ পর্যন্ত বাধ্যতামূলক মাস্ক পরতে বলা হয়েছে। মাস্ক পরাতে শুরুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ছিল কঠোর। মাস্ক পরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণের সমন্বয়ে দেশব্যাপী অভিযান চললেও করোনা নিয়ে বাড়ছে অসচেতনতা ও অবহেলা। করোনার ঝুঁকির কথা ভুলতে বসেছে নগরীর অনেক মানুষ।

জনবহুল শপিংমল, হাটবাজার, গণপরিবহন এবং রাস্তাঘাটে ক্রমেই ম্লান হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে স্বাস্থ্য সচেতনার বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। মাস্ক না পরতে দেখাচ্ছে নানা অজুহাত। মাস্ক ছাড়াই চলছে অধিকাংশ কাজ। রাজধানীর গাবতলী, ফার্মগেট, নিউ মার্কেট ও মতিঝিল এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, মাস্ক ছাড়াই অনেকে ঘোরাফেরা করছে। কেউ কেউ মাস্ক ঝুলিয়ে রেখেছে থুতনিতে। গণপরিবহনের শ্রমিক ও রিকশাচালকদের মধ্যে অধিকাংশের মুখে মাস্ক নেই। শ্যামলী এলাকার রিকশাচালক মনোয়ার বলেন, মাস্ক পরে রিকশা চালাতে কষ্ট হয়। তাই পকেটে মাস্ক রেখেছেন। ট্রান্স সিলভা পরিবহনের কন্ডাক্টর শামছুল বলেন, সারাক্ষণ যাত্রীরা ওঠানামা করছে। মাস্ক পরলেও করোনা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না বলে তার ধারণা। তাই মাস্ক খুলে রেখেছেন। রাজধানীর বেশ ক’টি বিপণি বিতান ও অফিস পাড়ায় দেখা গেছে ভবনে প্রবেশের আগে কোনো প্রকার তাপমাত্রা পরিমাপের ব্যবস্থা নেই। হাত ধোয়ার জন্য বেসিন নেই। কোথাও বেসিন থাকলেও সাবান কিংবা পানির ব্যবস্থা নেই।
এদিকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন করোনার ভ্যাকসিন আসার পরেও মাস্ক পরা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এই তিনটি কাজের বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা পরিস্থিতি যে কোনো সময় ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। মাস্ক পরা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘মানবিক উপায়ে সংযোগকে’ প্রতিপাদ্য করে জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে বলে জানিয়েছে একাধিক সংস্থা সূত্র।
ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, শীতের কারণে সংক্রমণ এবং মৃত্যু বেড়েছে। মানুষ স্বাস্থ্যবিধি আসলে মানছে না। মাস্ক পরে না। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখে না। এক্ষেত্রে এই তিনটি কাজ চালিয়ে যেতে হবে করোনার ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত। ভ্যাকসিন এলে সেটা কতটুকু কার্যকর হবে তা আমরা জানি না। ভ্যাকসিন দিলেই করোনা ভালো হয়ে যাবে তার গ্যারান্টি নেইতো। তবে করোনার ভ্যাকসিন এলেও এই তিনটি কাজ মাস্ক পরা, হাত ধোয়া এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এগুলো নিয়মিত করতে হবে। তাহলেই মহামারির এই সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মাস্ক পরেই সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব। এছাড়া সাবান দিয়ে হাত ধোয়া চালু রাখা এবং শারীরিক দূরত্ব মেনে অবশ্যই চলতে হবে। শুধু আইন দিয়ে হবে না। আইনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত অভিযানের সঙ্গে প্রচার- প্রচারণা বাড়াতে হবে। সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, অজানা সংক্রমণের উৎসটিকে বন্ধ করতে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। সাধারণ মানুষ যদি মনে করেন ‘গরিব মানুষের করোনা হয় না, করোনা হয় বড় লোকের’! তাহলে বড়লোকের জীবন বাঁচাতে গরিব লোকের পকেটের পয়সা খরচ করে কেন মাস্ক কিনবে? যারা পকেটে টাকা থাকার পরেও মাস্ক কিনে পরছে না তাদেরকে জরিমানা করতে হবে। এতে করে সচেতনতা বাড়বে। মাস্ক পরা যেহেতু স্বাস্থ্যবিধির অংশ- তাই প্রচারের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে। ভলান্টিয়ারের মাধ্যমে মাস্ক পরানো, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ইত্যাদি বিষয় মেনে চলবে। এবং ওয়ার্ডভিত্তিক জনপ্রতিনিধিদেরকে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী মাস্ক বিতরণ করতে হবে। ধুয়ে মাস্ক ব্যবহার করতে বলতে হবে। এভাবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে আমাদের যেতে হবে। জরিমানা করলাম অথচ মানুষ মানলো না। শেষে বিরক্ত হয়ে যেন বসে না যায়। আমাদের সংক্রমণটা কমাতে হবে।
ডিএমপি’র মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. ওয়ালিদ হোসেন বলেন, পুলিশসহ অন্যান্য সংস্থ্যার পক্ষ থেকে মাস্ক পরানোর কার্যক্রম চলছে। অভিযানের পাশাপাশি সর্বত্রই ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’- চালুসহ অন্যান্য যে জনসচেতনতামূলক উপায় রয়েছে সেগুলোও প্রয়োগ করছি আমরা। সেই হিসেবে অভিযান চলমান আছে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রচেষ্টা আগের মতোই আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার বিষয়ে শিথিলতা দেখা যাচ্ছে। শিথিলতা যাতে না থাকে সেজন্য প্রয়োজনে আমরা আরো কঠোর পদক্ষেপ নেবো। তবে শুধুমাত্র আইনগতভাবে ব্যবস্থা নিয়ে এটা কতোটা সফল হবে সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দিহান। জীবন রক্ষার্থে সাধারণ মানুষকে নিজেদেরই আগে সচেতন হতে হবে।