যুক্তরাষ্ট্রে শুরুতেই টিকার আওতায় বাংলাদেশিরাও

156

যুক্তরাষ্ট্রে জরুরিভিত্তিতে ১৪ ডিসেম্বর থেকে বায়োএনটেকের টিকার প্রয়োগ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে চলে এসেছে আরেক মার্কিন ওষুধ কোম্পানি মডার্নার টিকা।

ইতিমধ্যে কয়েক লাখ মানুষ টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছে। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি মার্কিনও রয়েছেন। টিকা গ্রহীতারা স্বস্তি আর আনন্দের কথা জানালেও কারও কারও মধ্যে সংশয়ও কাজ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ১১ ডিসেম্বর ফাইজারের টিকার অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ১৪ ডিসেম্বর দেশজুড়ে পর্যায়ক্রমে টিকা প্রয়োগ শুরু হয়। প্রথম দফায় সম্মুখ সারির স্বাস্থ্যকর্মী ও নার্সিং হোমে থাকা অতিঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের টিকা দেওয়া হচ্ছে।

নিউইয়র্কে প্রথম সপ্তাহে টিকা নিয়েছেন ৩৮ হাজার মানুষ। এই কর্মসূচির শুরুতেই টিকা নিয়েছেন বাংলাদেশি চিকিৎসক মাসুদুল হাসান (৫৮)। নিউইয়র্কে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে তিনিই প্রথম টিকাটি নিয়েছেন। ১৭ ডিসেম্বর সকালে ম্যানহাটনের মাউন্ট সিনাই হাসপাতালে তিনি ফাইজারের টিকা নেন। মাসুদুল হাসান মেট্রোপলিটন লার্নিং ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও পরিচালক।

নিউইয়র্কে স্বাস্থ্যসেবাসহ সামনের সারির জরুরি কাজে ২০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি জড়িত। এর মধ্যে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্য সহকারী, পুলিশ, ট্রাফিক, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্সকর্মী রয়েছেন। এ ছাড়া ক্যাব চালানোসহ বিভিন্ন প্রান্তিক কাজে জড়িত রয়েছেন আরও হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশি।

নগরীর কুইন্স জেনারেল হাসপাতালে স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে কাজ করেন সীমা সুস্মিতা। করোনার টিকা নিউইয়র্কে পৌঁছার প্রথম সপ্তাহেই তিনি তা নেন। সীমা বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য ভ্যাকসিন গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক নয়। তিনি কোনো সংশয় ছাড়াই ফাইজারের টিকা নিয়েছেন। অন্যান্য টিকার মতোই এটি নেওয়ার পর তার হাতে মৃদু ব্যথা ছাড়া আর কোন শারীরিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়নি। টিকা নেওয়ার পর ১৫ মিনিট তাঁকে নজরে রাখা হয়েছিল।

তবে টিকা কর্মসূচির শুরুতেই নিউইয়র্কের সব প্রবাসী বাংলাদেশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী টিকা নেওয়ার সুযোগ পাননি। এ ব্যাপারে আরেক প্রবাসী বাংলাদেশি চিকিৎসক ফেরদৌস খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, টিকার যে সরবরাহ এসেছে, তাতে প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশি স্বাস্থ্যকর্মীদের ১০ শতাংশের কম টিকা নিতে পেরেছেন। ফেরদৌস খন্দকার গত মার্চ থেকে নিউইয়র্কে অবস্থানরত করোনা সংক্রমিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সেবা দিয়ে আসছেন।

চিকিৎসক ফেরদৌস খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, নিউইয়র্কের বিভিন্ন হাসপাতালে এখন দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশি করোনায় সংক্রমিত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি নিজে এখন প্রায় ২০০ বাংলাদেশিকে সেবা দিচ্ছেন।

নিউইয়র্কেই বাংলাদেশিসহ অন্যদের অক্লান্ত সেবা দিচ্ছেন আরেক প্রবাসী চিকিৎসক জিয়াউদ্দিন আহমেদ (৬৬)। তিনি বলেন, তাঁর পরিবারের চার চিকিৎসক সদস্যের মধ্যে এ পর্যন্ত দুজন করোনার টিকা নিতে পেরেছেন। এঁরা হলেন, তাঁর স্ত্রী ফাতেমা আহমেদ (৫৮) ও মেয়ে নাহরীন আহমেদ (৩৫)। এই দুজনই ফাইজারের টিকা নিয়েছেন।

জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রথমে জরুরি সেবা বা সরাসরি করোনা রোগীদের সেবা দেওয়ার কাজে নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। চলতি সপ্তাহে মডার্নার টিকার সরবরাহ চলে এলে আরও বড় পরিসরে টিকা দেওয়া সম্ভব হবে।

নিউইয়র্কে টিকা নেওয়া অন্য প্রবাসী বাংলাদেশি চিকিৎসকদের মধ্যে রয়েছেন মুশফেকা মনসুর (৫৫), মোহাম্মদ ইসলাম (৫৭), আবুল কালাম আজাদ। তবে এখানে টিকা নেওয়ার ব্যাপারে সব বাংলাদেশিই সমান আগ্রহী নন। কারও কারও মধ্যে সংশয়ও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ পর্যন্ত যে কজন প্রবাসী বাংলাদেশি নিউইয়র্কে টিকা নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।

নিউইয়র্কে শুধু প্রবাসী বাংলাদেশি স্বাস্থ্যকর্মীরাই নন, অন্য পেশার বাংলাদেশিরাও টিকা নিচ্ছেন। অনেকে আবার টিকা নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁদের একজন নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তা রাজুব ভৌমিক। তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে টিকা নেওয়ার ব্যাপারে তাঁদের প্রস্তুতি রয়েছে। টিকা নেওয়ার বিষয়টি বাধ্যতামূলক নয়। এ কারণেই কেউ কেউ তেমন আগ্রহী নন। আবার কারও কারও মধ্যে সংশয়ও কাজ করছে।

নিউইয়র্কের ট্রাফিক কর্মকর্তা সৈয়দ উতবা বলেন, পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশি ট্রাফিক কর্মকর্তা এই নগরে কাজ করছেন। চলতি সপ্তাহেই তাঁদের টিকা দেওয়া শুরু হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে করোনার সংক্রমণে মারা যাওয়া বাংলাদেশি ও তাঁদের পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করছেন সাংস্কৃতিক সংগঠক বিশ্বজিৎ সাহা। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এ পর্যন্ত করোনায় চার শতাধিক বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু নিউইয়র্কেই মারা গেছেন ৩০০ জনের বেশি।

টিকা নিয়েছেন কুইন্সের এলমহাস্ট হাসপাতালের এনভায়রনমেন্ট বিভাগে কর্মরত সানিসাইডের বাসিন্দা, প্রয়াত শিল্পী সুবির নন্দীর ভায়রা অরুপ শ্যাম চৌধুরী। তিনি ২২ ডিসেম্বর এলমহাস্ট হাসপাতালের সম্মুখসারির কর্মী হিসাবে টিকা নেন।

করোনায় অরুপ চৌধূরীর স্ত্রী কবিতা শ্যাম চৌধুরী দুই সন্তান রেখে ২ এপ্রিল মারা যান। স্বাস্থ্যকর্মী অরুপ চৌধুরী বলেন, টিকা গ্রহনের খবর জেনে পরিবার ও বন্ধু–স্বজনদের কেউ কেউ তাঁকে অভিনন্দন জানান। টিকায় তাঁর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়নি।

নিউইয়র্কের গভর্নর এন্ড্রু কুমো জানিয়েছেন, গত সোমবার পর্যন্ত এখানে ফাইজারের টিকা নিয়েছেন ৩৮ হাজার মানুষ। জরুরি সরবরাহের আওতায় মডার্নার সাড়ে তিন লাখ ডোজ টিকা চলতি সপ্তাহেই নিউইয়র্কে পৌঁছাতে শুরু করবে। সপ্তাহের শেষ দিকে ফাইজারের আরও ১ লাখ ২০ হাজার টিকা পৌঁছাবে।

প্রথম আলো উত্তর আমেরিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ৩৭০ বাংলাদেশি মার্কিনের মৃত্যু হয়েছে। অক্টোবর থেকে দ্বিতীয় দফা সংক্রমণ শুরু হলে করোনায় আরও ৭৭ জনের মৃত্যু হয়। শুধু ডিসেম্বরেই ২৩ জন বাংলাদেশি মার্কিনের মারা যায়।

নিউইয়র্ক রাজ্যজুড়ে কমিউনিটি ভ্যাকসিন কিট তৈরি করা হয়েছে। রাজ্য ও নগর কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে এসব কিটে ভ্যাকসিন দেওয়ার সব সরঞ্জাম রাখা হয়েছে। করোনায় নিউইয়র্কে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষ্ণাঙ্গ, ল্যাটিনোসহ অভিবাসী কমিউনিটির মানুষের কাছে ভ্যাকসিন কিট দ্রুত সরবরাহ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

আসছে দুই সপ্তাহের মধ্যে অন্যান্য কমিউনিটির সঙ্গে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি মার্কিনও নিউইয়র্কে টিকার আওতায় চলে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।