সশস্ত্র বিক্ষোভে নামতে পারে ট্রাম্প সমর্থকেরা

167

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেনের অভিষেকের আগে আগে পুরো দেশে সশস্ত্র বিক্ষোভের পরিকল্পনার বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ২০ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় অভিষেক অনুষ্ঠানের আগে আগে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের রাজধানীতে সশস্ত্র বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে গতকাল সোমবার হুঁশিয়ারি দিয়েছে এফবিআই।

গত ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সমর্থকদের হামলার প্রেক্ষাপটে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। এরই মধ্যে এফবিআই জানাল, ২০ জানুয়ারি বাইডেনের অভিষেক অনুষ্ঠানের আগে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের রাজধানীগুলোতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষত আগামী রোববার (১৭ জানুয়ারি) ঘিরে বিশেষ হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংস্থাটি। এ ধরনের বিক্ষোভের আশঙ্কা অন্তত ২০ জানুয়ারির আগ পর্যন্ত থাকবে বলে সতর্ক করেছে এফবিআই।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার সেনা মোতায়েনের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে ন্যাশনাল গার্ডকে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত পর্যটকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকবে।

এ বিষয়ে মার্কিন ন্যাশনাল গার্ড ব্যুরোর প্রধান জেনারেল ড্যানিয়েল হোকানসন সাংবাদিকদের বলেন, রাজধানীর নিরাপত্তাসহ অন্যান্য বিষয়ে সহযোগিতার জন্য আগামী শনিবারের (১৬ জানুয়ারি) মধ্যে ওয়াশিংটনে প্রায় ১০ হাজার সেনা মোতায়েন করা যাবে বলে তিনি আশা করছেন। স্থানীয় প্রশাসন অনুরোধ করলে এই সংখ্যা ১৫ হাজার পর্যন্ত উন্নীত করা যাবে।

নিরাপত্তার জন্য আরও বেশি সেনা মোতায়েনে অন্তত একজন আইনপ্রণেতা পেন্টাগনে অনুরোধ পাঠিয়েছেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স। সংবাদ সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীর নিরাপত্তায় যে পরিমাণ সেনা মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে, তা যথেষ্ট কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সিনেটর ক্রিস মারফি।

এদিকে ‘আমেরিকা ইউনাইটেড’ স্লোগান নিয়ে অনুষ্ঠেয় আসন্ন অভিষেক নিয়ে জো বাইডেন সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমি বাইরে শপথ নিতে ভয় পাচ্ছি না। তবে যেসব লোক রাষ্ট্রদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, অন্যদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছেন, সরকারি স্থাপনা নষ্ট করছেন, বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার।’

ওয়াশিংটনের মেয়র ২০ জানুয়ারি ঘিরে বাড়তি নিরাপত্তার কথা জানিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির কাছে (ডিএইচএস)। ভারপ্রাপ্ত ডিএইচএস সেক্রেটারি চ্যাড উলফ জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের মেয়র মুরিয়েল বাউজার গত সপ্তাহে হওয়া অভাবিত ‘সন্ত্রাসী হামলার’ প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান পরিস্থিতিকে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে একেবারে আলাদা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এ অবস্থায় আগামী ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ওয়াশিংটনে পর্যটকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

কিন্তু মুরিয়েল বাউজার এতেই নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। তিনি ন্যাশনাল স্পেশাল সিকিউরিটি ইভেন্টের পরিসর আগামী ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বর্ধিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ২০ জানুয়ারি ঘিরে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরির কাজ ১৩ জানুয়ারি থেকে শুরু করার কথা জানিয়েছেন চ্যাড উলফ। সাধারণত ২০ জানুয়ারির অভিষেককে কেন্দ্র করে এই বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয় ১৯ জানুয়ারি থেকে।

এদিকে কঠোর নিরাপত্তা বলয় শুধু রাজধানী ঘিরে নেওয়া হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের রাজধানীতেই এমন নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের গভর্নরেরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাটলগ্রাউন্ড হিসেবে পরিচিত সুইং স্টেট উইসকনসিনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে অঙ্গরাজ্যটির কর্তৃপক্ষ। এই অঙ্গরাজ্যের গভর্নর টনি এভারস এরই মধ্যে অঙ্গরাজ্য ক্যাপিটলের পুলিশকে সহায়তার জন্য উইসকনসিন ন্যাশনাল গার্ডকে এখতিয়ার দিয়েছেন। একইভাবে মিশিগানের রাজধানী ল্যানসিংয়ে ক্যাপিটল ভবনের আশপাশে ও ভেতরে অস্ত্র নিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে অঙ্গরাজ্যটির ক্যাপিটল কমিশন।

নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের পুলিশ এরই মধ্যে দাঙ্গা-সাজে সজ্জিত হয়েছে। বেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুরো অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ। অনুরূপ অবস্থানে রয়েছে অন্য অঙ্গরাজ্যগুলোও। বিশেষত ব্যাটলগ্রাউন্ড হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলো রয়েছে বিশেষ সতর্ক অবস্থানে। রাজধানী এলাকায় আরোপ করা হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। হবে না-ই বা কেন? ডোনাল্ড ট্রাম্পের উগ্র সমর্থকগোষ্ঠী ও কট্টর রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলো বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে। তারা অনেকটা খোলাখুলিই এখন যুদ্ধের কথা বলছে। ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের অলিম্পিয়ায় ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের দেখ গেল ছোট এক দল বিক্ষুব্ধ দলের সামনে দাঁড়িয়ে। ন্যাশনাল গার্ড সদস্যরা যেমন রণসাজে, ঠিক তেমন সাজ দেখা গেল বিক্ষোভকারীদের অনেকের শরীরে। ‘নিজের শপথকে সম্মান কর’, ‘মুক্তির জন্য প্রতি দিন লড়’ ইত্যাদি স্লোগান দিচ্ছিল তারা।

আইডাহো অঙ্গরাজ্যের অ্যামন বান্ডির কথাই ধরা যাক। বিভিন্ন সময় সরকারবিরোধী আন্দোলন করে পরিচিতি পাওয়া এই ব্যক্তিকে দেখা গেল আইডাহোর গভর্নর কার্যালয়ের বাইরে ‘ওয়ান্টেড’ লেখা পোস্টারসহ নিজের সংগঠনের কর্মীদের নিয়ে অবস্থান নিতে। ওই পোস্টারে সাঁটা রয়েছে আইডাহোর গভর্নরের ছবি। নিজের অবস্থানের বিষয়ে অ্যামন বান্ডি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘এমন অনিশ্চয়তার সময়ে আমরা চাই আমাদের প্রতিবেশীরা আমাদের পাশে দাঁড়াক এবং এই দেশের ভেতরে চলমান যুদ্ধে আমাদের সঙ্গে একসঙ্গে লড়াই করুক।’

এ ধরনের নানা সরকারবিরোধী গোষ্ঠীর কাছ থেকে আসা হুমকি ও গত ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হওয়া হামলার প্রেক্ষাপটে সবগুলো অঙ্গরাজ্যই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এসব সংগঠনের পক্ষ থেকে আগামী ১৭ জানুয়ারি ৫০টি অঙ্গরাজ্যেই বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে আগেই। এর মধ্যে এফবিআইয়ের দেওয়া এই হুঁশিয়ারি সবাইকে আরও সচকিত করেছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গেভিন নিউসাম গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, সামনের দিনগুলোতে স্যাক্রামেন্টোয় বিক্ষোভের আশঙ্কায় সবাই ব্যাপক সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। প্রয়োজন হলে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হবে। ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাপিটলের সুরক্ষায় নিয়োজিত থাকবে ক্যালিফোর্নিয়া হাইওয়ে পেট্রল। তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই যে, আমরা উচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছি।’

সবচেয়ে মজার কথাটি বলেছেন টেক্সাসের আইনপ্রণেতা ব্রিসকো কেইন। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, ‘অস্টিনে আমাদের আইনসভা নিরাপদ। কারণ, এখানকার অধিকাংশ আইনপ্রণেতা নিজেদের সঙ্গে অস্ত্র রাখেন। আমার সঙ্গেও আছে। আমি চাই না এটা কখনো ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ুক।’