উপহারের টিকা এলো, এবার প্রয়োগের অপেক্ষা

241

উপহার হিসেবে পাঠানো ভারতের ২০ লাখ ডোজ টিকা গতকাল বুঝে পেয়েছে বাংলাদেশ। চলতি মাসেই ভারত থেকে কেনা আরো ৫০ লাখ ডোজ টিকা ঢাকায় পৌঁছাচ্ছে। বেক্সিমকোর মাধ্যমে পুনের সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে ওই টিকা কিনেছে সরকার। ভারত ছাড়াও রাশিয়া, চীনসহ একাধিক রাষ্ট্রের টিকা পাওয়ার চেষ্টা চলছে জানিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা বলছেন, টিকা বিষয়ক বৈশ্বিক অ্যালায়েন্স কোভ্যাক্সের মাধ্যমেও টিকা আসছে। উপহারের টিকা দেশে আসায় এখন অপেক্ষা তা প্রয়োগের। গতকাল সকালে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিশেষ বিমানে সিরামের তৈরি কোভিশিল্ড-এর ২০ লাখ ডোজ টিকা ঢাকায় আসে। বিমানবন্দর থেকে তা নিয়ে রাখা হয় কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের হিমাগারে। দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় উপহারের ভ্যাকসিন ভারতের তরফে হস্তান্তর করেন হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী।
উপহার গ্রহণ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন।

উপহার গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, এমপি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, টিকা পাওয়া নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। তাই এ নিয়ে যাতে দেশবাসী কোনো ধরনের গুজবে কান না দেয় সেই অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। গতকাল একাধিক অনুষ্ঠানে টিকা নিয়ে গুজব আর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করা ছাড়াও টিকাপ্রাপ্তিতে স্বস্তি প্রকাশ করেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, ‘ভ্যাকসিন আমরা খুব ভালোভাবে দেবো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক আমাদের এ বিষয়ে গাইড করছেন। আপনারা কোনো ধরনের গুজব ও ষড়যন্ত্রে কান দেবেন না। টিকা পাওয়া দরকার এমন একজন লোকও ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম থেকে বাদ পড়বে না। তবে টিকা নিয়ে কি ধরনের গুজব ছড়িয়েছে বা ছড়াচ্ছে, সরকার গুজব ঠেকাতে কি ব্যবস্থা নিচ্ছে? তা মন্ত্রী খোলাসা করেননি। উপহার হিসেবে পাওয়া ভারতীয় টিকা ঢাকাগামী বিমানে ওঠা থেকে শুরু করে পৌঁছানো, হস্তান্তর এবং ফ্রিজিং বা স্টোরেজ হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে ব্যাপক আগ্রহ ছিল মানুষের।

ভারতের টিকা উপহার হাসিনা-মোদি দৃঢ় সম্পর্কের নিদর্শন: এদিকে ২০ লাখ ডোজ টিকা উপহার হিসেবে পাঠানোকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যকার দৃঢ় সম্পর্ক ও শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে অভিহিত করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন। আনুষ্ঠানিকভাবে টিকা গ্রহণ করে মন্ত্রী দিনটিকে ‘এক ঐতিহাসিক দিন’ বলে উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে তিনি বলেন, তারা (হাসিনা ও মোদি) যে দৃঢ় সম্পর্ক অর্জন করেছেন, এটি সেই বন্ধনের নিদর্শন। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের কাছে ভারত সরকারের পাঠানো উপহার তুলে দেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী। এ সময় হস্তান্তর মঞ্চে অন্যান্যের মধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, এমপি উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তৃতায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমদিন থেকেই কোভিড-১৯ মোকাবিলায় অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন। ভারত থেকে প্রাপ্ত উপহারকে অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতার নিদর্শন উল্লেখ করে ড. মোমেন বলেন, ‘সহযোগিতা এবং অংশীদারিত্ব বিশ্বের প্রতিটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক উন্নত দেশ এখনো টিকা নিতে পারেনি এবং বিশ্বে প্রথম টিকা নেয়া দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম বলে দাবি করেন মন্ত্রী। সে সময় উপস্থিত স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, আজকে প্রমাণ হলো বন্ধু রাষ্ট্র একে অপরকে সাহায্য করবে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যেভাবে তারা সাহায্য করেছিল আজকে মহামারির সময়েও ওনারা আমাদের টিকা দিয়ে সাহায্য করলেন। ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যিক চুক্তি বাস্তবায়নে সহযোগিতা চেয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা আশা করি, সিরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে টিকা নিয়ে যে চুক্তি তা যেভাবে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা সেভাবে বাস্তবায়ন হবে। আমি ভারত সরকারকে অনুরোধ করবো, এই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটাও যেন উনারা দেখেন। যাতে আমরা ভ্যাকসিন পাই, সময়মতো।

সরকারের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে জাহিদ মালেক বলেন, আগামী ৬ মাসে ৫০ লাখ করে ভ্যাকসিন আসার কথা। এই মাসে আরো ৫০ লাখ ভ্যাকসিন আসবে। যদি আমরা পেয়ে যাই, তাহলে ৭০ লাখ ভ্যাকসিন আমাদের হাতে থাকবে। ৩৫ লাখ লোককে এই ভ্যাকসিন আমরা দিতে পারবো।
প্রতিবেশী প্রথম নীতির আওতায় ভারতের বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত বছরের ১৭ই ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এক ভার্চ্যুয়াল শীর্ষ বৈঠকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে ভারতে টিকা উৎপাদন করার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশকে দেয়া হবে। সেই অঙ্গীকার রক্ষা এবং বাড়তি হিসেবে উপহার পাঠানোর জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রত্যেকে ভারতের জনগণ এবং সরকারকে ধন্যবাদ জানান।

বাংলাদেশ অগ্রাধিকার: জয়শঙ্কর
এদিকে বাংলাদেশে টিকা পাঠানোর আগ মুহূর্তে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর হ্যাসট্যাগে ‘ভ্যাকসিনমৈত্রী’ উল্লেখ করে এক টুইট বার্তায় বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের অনুমোদিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পুনরায় নিশ্চিত হলো। আর হস্তান্তর অনুষ্ঠানে ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী বলেন, এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেয়া প্রতিশ্রুতির অংশ এবং ভারতের প্রতিবেশী প্রথম নীতির অংশ। পারস্পরিক বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এবং ভারত এক সঙ্গে কোভিড-১৯ এর মতো প্রাণঘাতী ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়বে বলেও উল্লেখ করেন ভারতীয় দূত।