অভিশংসনে পার পেয়ে যেতে পারেন ট্রাম্প

250

সদ্য সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অভিষেক অনুষ্ঠানের আগে ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্প সমর্থকেরা তাণ্ডব চালিয়েছিল। ওই তাণ্ডবে ‘প্ররোচনা’ দেওয়ার অভিযোগে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে ২৫ জানুয়ারি। এ নিয়ে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় অসদাচরণের অভিযোগে দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসন প্রক্রিয়ায় বিচারের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তারপরও ধারণা করা হচ্ছে, হয়তো এ যাত্রায় বেঁচে যেতে পারেন ট্রাম্প। আবারও পেতে পারেন প্রার্থিতার সুযোগ। কারণ, সিনেটে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তা অনেক দুর্বল প্রকৃতির। এ ছাড়া নিজের দল রিপাবলিকান পার্টি এখনো আশ্বাস দিয়েছে, দল ট্রাম্পের পক্ষেই আছে।

২২ জানুয়ারি সিনেটের নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা চাক শুমার ট্রাম্পের অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর পর এমন তথ্য জানিয়েছেন। তবে এ বিচার শুরুতে তাড়াহুড়া না করার পক্ষে মত দিয়েছেন ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির নেতারা। তাঁদের দাবি, বিচার মোকাবিলা করতে ট্রাম্পের আইনজীবীদের সময় দেওয়া উচিত।

১৩ জানুয়ারি প্রতিনিধি পরিষদে ২৩২-১৯৭ ভোটে এই অভিশংসন প্রস্তাব গৃহীত হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজের দলের ১০ জন আইনপ্রণেতা ওই ঐতিহাসিক পদক্ষেপে অভিশংসনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ৬ জানুয়ারি কংগ্রেস ভবনে ক্যাপিটলে তাণ্ডব চালান ট্রাম্প-সমর্থকেরা। ওই ঘটনার প্রেক্ষাপটে ‘বিদ্রোহে উসকানি’ দেওয়ার অভিযোগে ক্ষমতা ছাড়ার এক সপ্তাহে আগে ১৩ জানুয়ারি কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ ট্রাম্পকে অভিশংসিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো প্রেসিডেন্ট দুবার অভিশংসিত হলেন। এর আগে ক্ষমতার অপব্যবহার ও কংগ্রেসের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ২০১৯ সালে প্রতিনিধি পরিষদে ট্রাম্পকে অভিশংসন করা হয়। যদিও তৎকালীন রিপাবলিকান পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ সিনেট ট্রাম্পকে খালাস দেয়। ট্রাম্প প্রথম প্রেসিডেন্ট, যাঁকে ক্ষমতা ছাড়ার পরও অভিশংসনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি আবারও প্রার্থী হবেন। তবে তিনি যদি সিনেটে অভিশংসিত হন, তাহলে সিনেটররা তাঁকে ভবিষ্যতে যেকোনো রাজনৈতিক পদ গ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারেও ভোট দিতে পারবেন। আর ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করতে হলে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন। এর অর্থ ১০০ আসনের উচ্চ কক্ষে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অন্তত ১৭ জন রিপাবলিকানকে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দিতে হবে।

বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প সিনেটে তাঁর বিচার মোকাবিলার জন্য অন্তত একজন আইনজীবীকে নিয়োগ দিয়েছেন। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ২১ জানুয়ারি নিজ দলের সিনেটরদের জানিয়েছেন, সাউথ ক্যারোলাইনার আইনজীবী বাচ বায়ারকে নিয়োগ দিয়েছেন ট্রাম্প।

গ্রাহাম বলেন, ট্রাম্পের অভিশংসন মোকাবিলার জন্য একটাই যুক্তি তুলে ধরা হবে। আর তা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়া কোনো প্রেসিডেন্টকে বিচার করার নিয়ম নেই।

রিপাবলিকানদের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে আর অভিশংসনের মুখোমুখি দাঁড় না করানোর অনুরোধ জানানো হচ্ছে। একদিকে সংবিধানে এমন কোনো বিধান নেই এবং প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন, তার সঙ্গে বিষয়টি সাংঘর্ষিক বলে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। রিপাবলিকানদের এই যুক্তি মেনে তাঁকে অভিশংসনের মুখোমুখি না করালে, বা করালেও যুক্তি অনুযায়ী যদি ট্রাম্প নির্দোষ প্রমাণিত হন, তাহলে হয়তো ইচ্ছা অনুযায়ী ট্রাম্প ২০২৪ সালে আবারও প্রার্থী হতে পারবেন। আর যদি তা না হয়, তাহলে রাজনীতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৫৮ সালে প্রণীত সাবেক প্রেসিডেন্ট সম্পর্কিত ধারা অনুযায়ী সাবেক প্রেসিডেন্ট যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, যেমন জনগণের অর্থে অবসরভাতা, স্বাস্থ্যবিমা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুযোগ—সেসবও তিনি হারাবেন।

তবে ট্রাম্প শিবিরের আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, ন্যান্সি পেলোসি একবাক্যে রিপাবলিকানদের এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ২১ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, একজন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতার শেষ সময়ে এসে যা ইচ্ছা তা করবেন, এমন উদাহরণ মেনে নেওয়া যায় না। ট্রাম্প তাঁর সমর্থকদের দিয়ে ৬ জানুয়ারি কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটলে তাণ্ডব চালিয়েছেন। ভোটের ফলাফল পাল্টে ফেলার মধ্য দিয়ে দেশের গণতন্ত্রকে হুমকিতে ফেলার জন্য ট্রাম্প চেষ্টা করেছেন।

এদিকে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত দুই সিনেটরকে শপথ পড়িয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। এর মাধ্যমে সিনেটে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের আসনসংখ্যা সমান হলো, ৫০-৫০। সিনেটে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের ভোটদানের ক্ষমতা থাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন ডেমোক্র্যাটরা। সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও অভিশংসনে রিপাবলিকানদের ১৭ জনের সমর্থন না পেলে ট্রাম্প খালাস পেয়ে যাবেন। তবে ডেমোক্র্যাটরা মনে করছেন, সিনেটে ট্রাম্পকে অভিযুক্ত করতে রিপাবলিকানদের সমর্থন পাবেন তাঁরা।
সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক ডজনেরও বেশি রিপাবলিকান সিনেটর সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, অধিকাংশ রিপাবলিকান নেতাই ট্রাম্পের পাশে আছেন। তাঁরা ট্রাম্পকে নির্দোষ প্রমাণিত করতে চান।

মিসিসিপির রিপাবলিকান সিনেটর রজার উইকার বলেন, ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করার সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে।

টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর জন করনাইন বলেন, ‘ভোটে কী হবে জানি না। তবে আমার ধারণা, ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করার সুযোগ দুই-তৃতীয়াংশই নেই।

রিপাবলিকান নেতারা বলছেন, এই বিচার প্রক্রিয়ার জন্য যেসব নিয়ম রয়েছে এবং সিনেটের আগের বিচারের নজির বিবেচনায় নিলে এই বিচারের ফল ‘ন্যায্য বা যথাযথ’ হওয়ার কোনো সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেমোক্র্যাটদের লক্ষ্য হলো, দ্রুত এই বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করে আগামী ২১ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করে ফেলা। কিন্তু ট্রাম্পকে দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসন বিচার দ্রুত শুরুর বিরোধিতা করে ২১ জানুয়ারি রিপাবলিকান সিনেটর মিচ ম্যাককনেল বলেন, প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অন্তত দুই সপ্তাহের সময় দেওয়া হোক। অভিশংসনের প্রস্তাবটি সিনেটে আলোচনার জন্য ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত স্থগিত রাখার কথা জানিয়ে ম্যাককনেল বলেন, অভিশংসন মোকাবিলায় এই সময় দেওয়া প্রয়োজন। ২০ জানুয়ারির আগ পর্যন্ত সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা ছিলেন ম্যাককনেল।