নিউইয়র্কে ক্যাবিদের দুর্দিন কাটছেই না

183

করোনা মহামারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যস্ততম নগর নিউইয়র্কের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। করোনায় পাল্টে গেছে এই নগরের স্বাভাবিক চিত্র। এখনো ফিরছে না প্রাণের স্পন্দন। থেমে গেছে কোলাহল। যারা ২৪ ঘণ্টা জাগিয়ে রাখেন এই নগর, সচল রাখেন নগরের গতির চাকা, সেই ক্যাবচালকেরা আছেন বিপাকে। কাটছে কর্মহীন জীবন। এর ওপর কোভিড–১৯–এর ভয়াল থাবা কেড়ে নিয়েছে এই পেশার অর্ধশতাধিক মানুষের প্রাণ।

পেশাজীবী এই ক্যাব চালকেরা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রেখে আসছেন। জনপ্রতি ১০০ ডলার হিসেবে প্রতিদিন ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আসত বাংলাদেশি ক্যাবচালকদের ঘরে। এই অর্থের সিংহভাগ বাংলাদেশের জিডিপিতে যোগ হতো। এখন দেশ বঞ্চিত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স থেকে।

লকডাউনের কঠিন সময়ে জীবন বাজি রেখে ট্যাক্সি চালকেরা সচল রেখেছেন নিউইয়র্ক নগরকে। যখন পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সাবওয়ে (আন্ডার গ্রাউন্ড ট্রেন) বাসসহ সব সার্ভিস বন্ধ ছিল। তাঁরাই পরিবহন করেছেন চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিকসহ সম্মুখসারির সব কর্মীকে। করোনার সংকটকালে ক্যাবিরা মানুষের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন। পেয়েছেন সম্মুখসারির কর্মীর কাজের স্বীকৃতি।

করোনার কারণে এই শিল্পে জড়িত প্রায় ৩০ হাজার বাংলাদেশির মধ্যে ২০ হাজার চালক বেকার হয়ে পড়েছেন। মরণব্যাধি করোনার ভয়াল থাবা এদের সাজানো জীবন তছনছ করে দিয়েছে। যেখানে একজন ট্যাক্সিচালক গড়ে প্রতিদিন ৩০০ ডলার আয় করেছেন, তাঁদের সংসারে চলছে এখন আর্থিক অনটন। অথচ ট্যাক্সি চালকদের অর্থে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কমিউনিটির মসজিদ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় সব সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে। এরাই ছিলেন এসব কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি।

কোভিড–১৯ অতিমারি শুরুর পর সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন ক্যাবিরা। নিউইয়র্কে ট্যাক্সির যাত্রী পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। রাস্তাঘাটে মানুষজনের চলাচল সীমিত। ব্যবসা–বাণিজ্য অচল, দোকানপাটে ঝুলছে তালা। বন্ধ রয়েছে হোটেল রেস্তোরাঁ। অতি জরুরি কাজ ছাড়া বাইরে বেরোতে চায় না কেউ। কেবল জরুরি পরিষেবা ছাড়া বাকি সব স্তব্ধ হয়ে গেছে। লোকের ভিড়ে গিজগিজ করা নিউইয়র্কে নেই আগের মতো পর্যটকদের আনাগোনা। এয়ারলাইনসগুলোর ফ্লাইটও বন্ধ রয়েছে। যেখানে জেএফকে ও লাগোর্ডিয়া বিমানবন্দরে প্রতিদিন কয়েক শ ফ্লাইট উঠানামা করত, সেখানে রাজ্যের নিস্তব্ধতা। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর জনএফ কেনেডি থেকে প্রতিদিন ৮ শতাধিক ফ্লাইট পরিচালিত হতো। আগমন–বহির্গমন মিলিয়ে শতাধিক গেট রয়েছে জেএফকেতে। লাগোর্ডিয়া চলাচল করত প্রায় দু শ ফ্লাইট। ৪১টি গন্তব্যে যাতায়াত করত উড়োজাহাজ।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নিউইয়র্কের এই দুই বিমানবন্দর দিয়ে কেবল ২০১৭ সালে প্রায় ৯ কোটির বেশি যাত্রী চলাচল করেছেন। এর মধ্যে জনএফ কেনেডি বিমানবন্দর দিয়েই ৬ কোটির বেশি এবং লাগোর্ডিয়া হয়ে প্রায় ৩ কোটি যাত্রী আসা-যাওয়া করেছে।

যাত্রী সংখ্যা এখন তলানিতে ঠেকেছে। অথচ করোনার আগে প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ যাত্রী পরিবহন করতেন ক্যাবিরা। এই সময়ে সেই সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশই কমেছে। এখন ট্যাক্সিক্যাবের লিজের অর্থ পরিশোধ চালকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। নিউইয়র্কের গ্যারেজগুলোতে পড়ে আছে সারি সারি ক্যাব। আগে ইয়েলো ক্যাব দুজনে দুই শিফটে ভাগ করে চালাতেন। সপ্তাহে লিজ ছিল ১ হাজার ৫০০ ডলার। এখন ৪০০ ডলার লিজেও কেউ গাড়ি নিতে রাজি নয়। বর্তমানে ১৫ ঘণ্টা কাজ করেও ১০০ ডলার আয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নিউইয়র্ক নগরে প্রায় ২ লাখ মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে বাংলাদেশি অভিবাসী চালক রয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি।

ঢাকায় যেমন রিকশার সংখ্যা, নিউইয়র্কে তেমনি ট্যাক্সিক্যাবের সংখ্যা। এই নগরে ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি ট্যাক্সি চলাচল করে থাকে। এখানে যে কত ধরনের ও কত কোম্পানির ট্যাক্সিক্যাব রয়েছে, তার হিসাব রাখা মুশকিল। তবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ক্যাবের মধ্যে রয়েছে—ইয়েলো ক্যাব, গ্রিনক্যাব, ব্ল্যাকক্যাব, লিভারি, লিমোজিন সার্ভিস ইত্যাদি। এর বাইরে রয়েছে অ্যাপভিত্তিক ক্যাব উবার, লিফট, ভিয়া ইত্যাদি।

যুক্তরাষ্ট্রে ট্যাক্সিক্যাব চালকদের অভিভাবক সংগঠন ট্যাক্সি ইউনিয়ন নিউইয়র্ক ট্যাক্সি ওয়ার্কার অ্যালায়েন্সের লেবার অর্গানাইজার মো. টিপু সুলতান বলেন, করোনার এই দুঃসময়ে ট্যাক্সি চালকেরা কী কষ্টে আছেন, তা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে তাঁরা যা আয় করেছেন, সবকিছু পাঠিয়ে দিয়েছেন দেশে। জায়গা-জমি, বাসা-বাড়ি, সহায়–সম্পত্তি যা কিছু করেছেন সবই দেশে, দেশের জন্য। এই বিপদের সময়ে এসবের কোনো কিছুই কাজে আসছে না। হাতে সামান্য সঞ্চয় যেটুকু ছিল, তাও ফুরিয়ে আসছে।

দীর্ঘ ৪ বছর আন্দোলন সংগ্রাম করে ২০১৮ সালে ট্যাক্সি অ্যালায়েন্স সিটিতে উবারের নতুন গাড়ি নামানো বন্ধে একটি আইন প্রণয়ন করে। এর ফলে উবারের নতুন গাড়ির অনুমোদন দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

মো. টিপু সুলতান বলেন, মহানগরে উবার, লিফট এদের গাড়ি রয়েছে লক্ষাধিক। ইয়েলো ক্যাব প্রায় ১৪ হাজার। গ্রিন ক্যাব, ব্ল্যাক ক্যাব, লিভারি ও লিমোজিন মিলিয়ে হবে আরও ১৫ হাজারের বেশি। চালকদের একমাত্র ইউনিয়ন ন্যাশনাল ট্যাক্সি ওায়ার্কার অ্যালায়েন্স চালকদের স্বার্থে নিরলসভাবে কাজ করছে।