গ্রীষ্ম শেষে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রতিশ্রুতি বাইডেনের

199

আগামী গ্রীষ্মের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের জীবনকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। গতকাল মঙ্গলবার দেওয়া বক্তব্যে বাইডেন গ্রীষ্মের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ কোটি মানুষের জন্য টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন বাইডেন। এই প্রতিশ্রুতির মধ্যে অনেকেই রাজনৈতিক ঝুঁকি দেখছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানোর যে সময়কালের কথা বাইডেন তাঁর প্রতিশ্রুতিতে উল্লেখ করেছেন, তাতে সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখের উল্লেখ নেই। কিন্তু গ্রীষ্মের শেষ নাগাদ কথাটার মধ্য দিয়ে পরোক্ষে একটি নির্দিষ্ট সময়ের কথা বলা হয়ে গেছে। এ কারণেই বিশ্লেষকেরা এই প্রতিশ্রুতিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছেন। কারণ, এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে না পারলে, তা তাঁর প্রেসিডেন্সির শুরুতেই তাঁকে ব্যর্থ বলে প্রতীয়মান করবে।

জো বাইডেন তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সফল হলে, করোনা মহামারি মোকাবিলায় ২৬ জানুয়ারি তারিখটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। কিন্তু তা না পারলে, তাঁকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যর্থতার ধারাবাহিকতাকে মাথা পেতে নিতে হতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প গেল বছর সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছেন, করোনা মোকাবিলায় দ্রুত কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে। বাইডেন নিশ্চিতভাবেই তার থেকে ভিন্ন পথে হাঁটছেন শুরু থেকেই। কিন্তু মানুষ মহামারির ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। ক্রমাগত আক্রান্ত বাড়ছে, বাড়ছে মৃত্যু। এ অবস্থায় মানুষকে আশ্বস্ত করতেই বাইডেন হয়তো এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মুশকিল হচ্ছে, এই প্রতিশ্রুতি রাখতে না পারলে তাঁর প্রশাসন এমন বিপাকে পড়বে যে, মহামারি শেষেও নিজের অন্য লক্ষ্যগুলো অর্জনের পথে তাঁকে ভুগতে হবে ভীষণভাবে।

সিএনএন জানায়, ক্ষমতা গ্রহণের পর গত ছয় দিন বাইডেন ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন বিশেষত কোভিড মোকাবিলায় অঙ্গরাজ্য, স্থানীয় ও ফেডারেল প্রশাসনের সমন্বয় ঘটিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু এও সত্য যে, করোনা মহামারির শুরু থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে এত সমন্বয়হীনতা হয়েছে যে, একে খুব দ্রুত এক পাটাতনে নিয়ে আসা কঠিন।

বাইডেন মঙ্গলবার আরও ২০ কোটি ডোজ করোনা টিকা কেনার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘(সরকারি) উদ্যোগের অপেক্ষায় থাকা জাতিকে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই যে, সহায়তা আসছে।’ বাইডেন নতুন কেনা এই ২০ কোটি ডোজ কয়েক দিনের মধ্যেই অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে সরবরাহ ও বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছেন।

সিএনএন বলছে, বাইডেনের ২৬ জানুয়ারি দেওয়া ঘোষণা একই সঙ্গে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক। প্রায় এক বছর ধরে লকডাউন, সামাজিক মেলামেশা রহিত মৃত্যু ও যন্ত্রণার সমাজের মানুষ যখন এক ভয়াবহ শীত পার হচ্ছে, যখন সামনে কোনো আশা নেই বলে মনে করছে তারা, তখন তাদের উদ্দীপ্ত করতে বাইডেনের এই প্রতিশ্রুতি বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। তাঁর দ্রুত পদক্ষেপের কারণে এবং এমন আশার বাণী শোনানোয় মানুষ নিশ্চিতভাবেই আশাবাদী হবে। আর এখানেই রয়েছে চরম ঝুঁকিটি। কারণ, জাগিয়ে তোলা এ আশার সাম্পান যদি ডুবে যায়, তবে তারা বাইডেনকেই দায়ী করবে, যা তাঁর প্রশাসনের অন্য কাজগুলোকে বাধাগ্রস্ত করবে। এ ক্ষেত্রে মার্কিন সমাজে সরকারের প্রতি পুঞ্জীভূত অনাস্থা আবার জেগে উঠবে, যার নির্মাতা সাবেক ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন।

তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে আশার বিষয় হচ্ছে, মানুষ বুঝতে পারছে যুক্তরাষ্ট্রে একটি ফেডারেল সরকার আছে, যে পরিস্থিতিকে অস্বীকারের বদলে তার মুখোমুখি হতে চাইছে। করোনার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে মাথায় রেখে রাষ্ট্রের প্রতিটি বিষয়কে নিজেদের পরিকল্পনার অংশ করে নিয়েছে তারা।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রথম দিন থেকেই জো বাইডেন যেভাবে উদ্যোগী হয়েছেন, তাতে আইনপ্রণেতারাও হয়তো নড়েচড়ে বসবেন। এমনকি রিপাবলিকান নেতাদেরও হয়তো তিনি আস্থায় নিতে পারবেন। করোনা মোকাবিলায় বাইডেন ঘোষিত পুনরুদ্ধার প্যাকেজ পাস করাতে এটি ভীষণভাবে জরুরি। এই প্যাকেজ পাস না হলে, টিকাদান কর্মসূচি বেগবান করতে প্রয়োজনীয় তহবিলের সংস্থান হবে না।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এক নতুন আশার বাণী শুনিয়েছে। নিজেদের গবেষণার বরাত দিয়ে তারা বলেছে, যাবতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা নীতি মেনে সশরীরে স্কুল খুলে দেওয়া যেতে পারে। এটি বড় আশার কথা। কারণ, স্কুল বন্ধ থাকায় এর প্রভাব শুধু শিশুদের ওপরই পড়ছে না, এটি তাদের অভিভাবকদেরও এক ভয়াবহ সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে। অনেক অভিভাবকের পক্ষেই শিশুযত্ন কেন্দ্রের সহায়তা ছাড়া নিজেদের কাজ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। এর বড় প্রভাব পড়ছে অর্থনীতির ওপর। কিন্তু এখন স্কুল খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষক ইউনিয়ন হয়তো মানতে চাইবে না। ডেমোক্রেটিক দলের সমর্থকদের মধ্যে আবার এই শিক্ষক সম্প্রদায় বেশ প্রভাবশালী। ফলে সব মিলিয়ে জো বাইডেন প্রশাসন একটা আশার আলো সামনে নিয়ে এলেও তা অর্জনের খাতায় নিয়ে আসাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে।

এরই মধ্যে করোনা মোকাবিলায় বাইডেনের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো। সিএনএনকে তিনি বলেন, ‘এখন আপনার সামনে যোগ্য ও পেশাদার একটি ফেডারেল সরকার আছে, যারা সত্য বলছে।’

শুধু কুমোই নন, অঙ্গরাজ্যগুলোর গভর্নরেরাও বাইডেনের পদক্ষেপে আশ্বস্ত হচ্ছেন। এরই মধ্যে হোয়াইট হাউসের করোনাভাইরাস সমন্বয়ক জেফরি জিন্টস আশ্বস্ত করেছেন, কোন অঙ্গরাজ্যে কতসংখ্যক টিকা যাবে, তা এখন থেকে তিন সপ্তাহ আগেই জানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে এই সরবরাহ ও বিতরণকাজে কর্মী সংখ্যাও বাড়ানো হবে। আগামী সপ্তাহ থেকেই অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে টিকা সরবরাহ ১৬ শতাংশ বাড়ানো হবে।

করোনার টিকা বিতরণ কর্মসূচি নিয়ে হিমশিম খাওয়া অঙ্গরাজ্যগুলোর কর্তৃপক্ষের কাছে এর চেয়ে বড় আশার বাণী আর হতে পারে না। এটি শেষ পর্যন্ত করা গেলে তা জো বাইডেন প্রশাসনের জন্য বড় অর্জন হয়ে আসবে, যা সামনের কাজগুলোকেও অনেক সহজ করে দেবে।