বাইডেনের অভিবাসন পরিকল্পনা বদলে দেবে তাদের জীবন

158

যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ দিন ধরে বসবাস করা অনিবন্ধিত অভিবাসীদের জন্য নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ উন্মুক্ত করছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তাঁর প্রস্তাবিত অভিবাসন পরিকল্পনা কংগ্রেসে পাস হলে এ দেশে বর্তমানে থাকা ১১ মিলিয়ন অনিবন্ধিত অভিবাসীর জন্য নাগরিকত্বের দরজা খোলার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এই পরিকল্পনা নিশ্চিতভাবে আশা তৈরি করছে। কিন্তু যাদের লক্ষ্য করে এই পরিকল্পনা, সেই অনিবন্ধিত অভিবাসীরা এ নিয়ে কী ভাবছেন? তাঁরা একে কতটা ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে যেতে হবে অভিবাসীদের কাছেই। যেমন, বাইডেনের পরিকল্পনা শোনার পরপরই মেরিল সালডা ঠিক করেছেন, তিনি মাকে দেখতে মেক্সিকো যাবেন যত দ্রুত সম্ভব। অর্থাৎ একটা আশার আলো দেখছেন তিনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপের সময় তাই তিনি কোনো ভাবনা ছাড়াই শুরুতে নিজের এই পরিকল্পনার কথা বলেন। ঠিক একইভাবে বাইডেনের কথায় আশান্বিত হয়ে তাৎক্ষণিক নিজের একটি পরিকল্পনা তৈরি করে নিয়েছেন কারিনা রুইজ। কী করবেন কারিনা রুইজ? সিএনএনকে তিনি বলেন, ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হবেন। দীর্ঘ দিন ধরে অন্যদের নিবন্ধনে সহযোগিতা করে এলেও নিজে কখনো ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারেননি। কারণ একটিই, কাগজ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত অনিবন্ধিত অভিবাসীদের সঙ্গে আলাপ করে সিএনএন এমন চিত্রই পেয়েছে। এ সম্পর্কিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাইডেনের অভিবাসন পরিকল্পনা অনিবন্ধিত অভিবাসীদের আশাবাদী করেছে। একই সঙ্গে জন্ম দিয়েছে উদ্বেগেরও। মূলত, কংগ্রেসে এই প্রস্তাব টিকবে কিনা, তা নিয়েই উদ্বেগ। রয়েছে নিজেদের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে নানা ভাবনাও।
বাইডেনের পরিকল্পনা ঘোষণার পর ইলিনয়ের বাসিন্দা গ্লো হার্ন চোইয়ের মাথায় প্রথম এসেছে একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স করার সম্ভাবনার বিষয়টি। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আসা এই অনিবন্ধিত অভিবাসী সিএনএনকে বলেন, ‘একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স আমাদের পরিবারের ভাগ্যটাই বদলে দিতে পারে। আমি এখন ডাকার (ডিফারড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভালস) জন্য আবেদন করছি। আমার মা-বাবার জন্যও অনুরূপ সুরক্ষা থাকলে খুবই ভালো হতো। সে ক্ষেত্রে তাঁরা এই দেশে নির্বিঘ্নে থাকতে পারতেন, বাইরে বের হতে ভয় পেতেন না। আমরা সব সময়ই এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে থাকি। আমার বয়স যখন এক বছরেরও কম, তখন আমরা এখানে আসি। (সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক) ওবামার সময় যখন অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়ন শুরু হয়, তখনই আমরা বুঝলাম, আমাদের কোনো কাগজ নেই। তখনই জানলাম, পুলিশ যেকোনো সময় আমাদের আটক করতে পারে এবং পাঠিয়ে দিতে পারে সেই দেশে, যাকে আমি এমনকি চিনিও না। আমাদের কেউ কোথাও গেলে তার ফেরা নিয়ে পর্যন্ত অন্যরা আতঙ্কে থাকে। “নিরাপদে ফিরেছি”—এটাই আমাদের পরস্পরকে পাঠানো নিত্যকার বার্তা। আমি শুরুতেই হয়তো একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স করব, যা আমাকে কোনো সংকট ছাড়াই দেশের যেকোনো প্রান্তে যাওয়ার নিশ্চয়তা দেবে।’

চোই বলেন, ‘বাইডেন যে প্রস্তাব করেছেন, তা ঠিক সেভাবেই কংগ্রেসে পাস হবে কিনা, হলে কবে হবে, এটাই আমার মূল চিন্তার বিষয়। এই প্রস্তাব পাস হলে আমার জন্য গ্রিনকার্ড ও নাগরিকত্ব পাওয়ার দরজা খুলবে। কিন্তু আমার কাছে সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি বলেন, ‘আমাকে মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকে উপার্জনে নামতে হয়েছে। রেস্তোরাঁয় খাবার পরিবেশনকারী, বাসবয়, বারটেন্ডার, ডিশওয়াশার, ডেলিভারি ড্রাইভার—কী করিনি আমি। এটা খুবই কঠিন একটা বিষয়। বিশেষত, একজন তরুণের জন্য, যখন তার বন্ধুদের অধিকাংশই জীবন উপভোগে ব্যস্ত। আমার মাকে দেখেছি নিজের বয়সের তুলনায় বেশি বুড়িয়ে যেতে। আমার কাছে তাই সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমার মা যেন অন্তত আট বছর বিশ্রাম নিতে পারেন, তাঁর যেন একটা অবসরকাল থাকে।’

কারিনা রুইজ বর্তমানে অ্যারিজোনায় বাস করেন। একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। মেক্সিকো থেকে আসা এই অনিবন্ধিত অভিবাসী সিএনএনকে বললেন, ‘প্রথমেই আমি ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হব। গত পাঁচ বছরে আমি বহু মানুষকে ভোটার নিবন্ধনে সহায়তা করেছি। আমি চেয়েছি, তারা যেন আমার হয়ে কথা বলেন। অ্যারিজোনায় আমার কোনো অবস্থান ছিল না। কারণ এখানে পড়াশোনার জন্য বৈধ বাসিন্দা হতে হবে বলে একটি আইন পাস করা হয়। এ কারণে আমার জৈব রসায়নে স্নাতক সম্পন্ন করতে ১২ বছর সময় লাগে। কিন্তু আমি আমার লক্ষ্যের দিকে এগোতে পারিনি। আমি এবং আমার মতো যারা গত চার বছরে ডাকা কর্মসূচির জন্য যোগ্য হলেও পায়নি, তাদের জন্য লড়াই করতে হয়েছে আমাকে। আমার স্বপ্ন আমি জৈব রসায়নের দুনিয়ায় আবার ফিরে যাব। আমি বিজ্ঞান পড়াতে চাই; করতে চাই গবেষণা। নাগরিকত্ব পেলে এই সবই আমি করতে পারব।’

এ ক্ষেত্রে অনেক বাস্তববাদী বলতে হবে হোসে আন্তোনিও ভার্গাসকে। ৩৯ বছর বয়সী এই ভ্রমণপ্রেমী থাকেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। বাইডেনের অভিবাসন পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এই প্রস্তাব নিঃসন্দেহে দারুণ। আমি জানি, একে আইনে পরিণত করাটা ভীষণ কঠিন। এটা স্রোতের বিপরীতে চলার একটা প্রয়াস। এটাকে দারুণ শুরু বলতে হবে। প্রশাসন অবশেষে বালির ওপর একটা দাগ তো টানল। মিসিসিপি, উইসকনসিন বা আইওয়া—যেখানেই গেছি একটাই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি—কেন আমি বৈধতা নিচ্ছি না। অবাক হতাম এই ভেবে, মানুষ কেন অভিবাসন বিষয়টিকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করে না। আমার মতো মানুষেরা বৈধ হতে পারেনি, কারণ তারা এই প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল না। বাইডেন-হ্যারিস প্রশাসন এটা পরিষ্কার করে দিয়েছে, তারা এই প্রক্রিয়াটিকে মানুষের জন্য তাদের হাতেই তুলে দিতে চাইছে।’