সরকার ও হেফাজত দুই পক্ষই কৌশলে

101

দেশের কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম ইস্যুতে নরমে-গরমে কৌশলী অবস্থান নিয়েছে সরকার। গত ২৬ মার্চ থেকে তিন দিন ধরে হেফাজতের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হাটহাজারীসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সহিংস ঘটনার সঙ্গে সরাসরি ও নেপথ্যে যারা জড়িত তাদের বিষয়ে সরকার কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। একই সঙ্গে ২০১৩ সালে হেফাজতের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিকে ঘিরে যে সহিংসতা হয়েছিল, সেই মামলাগুলোও সামনে এনে জড়িতদের আইনের মুখোমুখি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে এগোচ্ছে সরকার ও প্রশাসন। এছাড়া হেফাজতের বর্তমান নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে। চলমান প্রেক্ষাপটে হেফাজতের কোনো কোনো নেতা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা বললেও সংগঠনটির এখনকার নেতৃত্ব নিয়েই সরকার এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের নেতিবাচক মনোভাব বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ পেয়েছে। সরকারবিরোধী বিভিন্ন ইসলামপন্থি দলের নেতারা হেফাজতের নেতৃত্বে রয়েছেন বলে আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ।

তবে সংগঠন হিসেবে হেফাজতে ইসলাম ও এর বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী-সমর্থকের বিষয়ে এখনই বিপরীত অবস্থানে যাওয়ার পক্ষে নয় সরকার। কারণ সরকারের নীতিনির্ধারক মহল মনে করছে, সহিংসতা ও সরকারবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে হেফাজতের সবাই জড়িত নন। সরকারের এই অবস্থানের পরিষ্কার বার্তা মেলে গত ৪ এপ্রিল চলতি একাদশ জাতীয় সংসদের দ্বাদশ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া সমাপনী বক্তব্যে। ঐ বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমন ঘিরে যে সংঘাত-সহিংসতা হয়েছে সেটি উল্লেখ করে বলেছেন, ‘হেফাজতের সবাই যে এর মধ্যে জড়িত, তাও কিন্তু নয়। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা।’ সেদিন প্রধানমন্ত্রী এটাও বলেছেন, ‘হেফাজতের সদস্যদের অনুরোধ করব—তারা যেন বুঝে নেন যে কোন নেতৃত্ব তাদের।’

হেফাজতের নেতাদের অভিযোগ, এ পর্যন্ত তাদের সংগঠনের আলোচিত নেতা মামুনুল হকসহ ১০ জন কেন্দ্রীয় নেতা এবং মাঠপর্যায়ে প্রায় ২০০ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম-মহাসচিব ও হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগরের নায়েবে আমির মাওলানা কোরবান আলী কাসেমীকেও গতকাল মঙ্গলবার গ্রেফতার করা হয়েছে।

এই অবস্থার মধ্যেও কোনো রকম জ্বালাও-পোড়াও কিংবা সহিংসতায় না গিয়ে সংগঠনের নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের আমির জুনাইদ বাবুনগরী। সোমবার এক বিবৃতিতে বাবুনগরী বলেছেন, ‘হেফাজতে ইসলাম দেশে নৈরাজ্য ও সন্ত্রাস চায় না। হেফাজতে ইসলাম একটি সুশৃঙ্খল ও শান্তিপ্রিয় সংগঠন।’ একই দিনে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, ‘হেফাজতে ইসলাম ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমনের বিরোধিতায় কোনো কর্মসূচি দেয়নি। সংগঠনের কিছু নেতা ব্যক্তিগতভাবে তাদের বক্তব্যে বিষয়টিকে সামনে এনেছেন।’

হেফাজতে ইসলামের একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, চলমান পরিস্থিতিতে এখনই আন্দোলনের কর্মসূচিতে যাওয়ার পক্ষে নন তারা। বরং সংগঠনের নেতৃত্বে মুরব্বি এবং অরাজনৈতিক নেতা যারা আছেন, তাদের মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টাকেই উত্তম পথ বলে তারা মনে করছেন। হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব নুরুল ইসলাম জেহাদী বলেছেন, পুরো পরিস্থিতি হেফাজতকে সংকটে ফেলেছে। এখন তারা গ্রেফতারকৃতদের জন্য আইনি লড়াই চালাবেন এবং একই সঙ্গে তারা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছেন।

হেফাজতের একজন কেন্দ্রীয় নেতা ইত্তেফাককে জানান, সংগঠনটির মুরব্বি ও অরাজনৈতিক নেতাদের কয়েক জন সোমবার পুলিশের ঊর্ধ্বতন কয়েক কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে সংকট সমাধানের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। নুরুল ইসলাম জেহাদী বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমেই তারা সমাধানের আশা করছেন। তিনি বলেন, সার্বিক বিষয়ে পরামর্শের মাধ্যমে একটা সুরাহা হবে বলে আশা করি। পরস্পরের মধ্যে আলোচনা করে যদি একটা ভুল-বোঝাবুঝির নিরসন হয়, সেটা তো খারাপ না।

হেফাজতের নায়েবে আমিরের পদ থেকে কয়েক দিন আগে পদত্যাগ করেছেন আব্দুল্লাহ মো. হাসান। তিনি বলেছেন, সংগঠনটির কিছু নেতার ভুলের কারণে এখনকার সংকট তৈরি হয়েছে। জ্বালাও-পোড়াও বা সহিংসতা সমর্থন না করার কারণে হেফাজত থেকে পদত্যাগ করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। মো. হাসান আরো বলেন, কিছু হুজুরের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আজকে গোটা আলেম সমাজ এবং কওমি মাদ্রাসার ওপর একটা চাপ তৈরি হয়েছে।

আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টার অংশ হিসেবেই সংগঠনের মহাসচিব নুরুল ইসলাম জেহাদীর নেতৃত্বে সোমবার রাতে হেফাজতে ইসলামের একটি প্রতিনিধিদল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে তার বাসায় দেখা করেছেন। বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, হেফাজত নেতাদের যাতে গণগ্রেফতার না করা হয় তারা সেই দাবি জানিয়েছেন।

এই বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগ ও সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী-নেতারা যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটি বিশ্লেষণ করলেও যে বিষয়টি প্রতীয়মান হয় তা হলো—সরকার বা প্রশাসন ঢালাওভাবে হেফাজতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে না, বরং সরকার কৌশলী ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘কোনো গণগ্রেফতার হচ্ছে না। যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত, ঠিক তাদেরই গ্রেফতার করা হচ্ছে।’

জানা গেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে হেফাজত নেতারা কওমি মাদ্রাসাগুলো খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। কামরাঙ্গীরচর হাফেজ্জি হুজুরের ছেলে এই দাবি জানান বৈঠকে। এছাড়া নেতাকর্মীদের গ্রেফতার বন্ধের দাবি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে হেফাজতের নেতারা বলেছেন, সংগঠিত সহিংসতার সঙ্গে অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তিও জড়িত থাকতে পারে। গভীর তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পরদিন গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, সহিংসতার ঘটনায় কোনো দল বা আলেম-ওলামা দেখে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। যারা এ তাণ্ডবলীলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত, বাড়িঘরে হামলা ও আগুন দিয়েছে, তাদের ভিডিও দেখে গ্রেফতার করা হয়েছে।

রাজশাহী সড়ক জোন, বিআরটিসি, বিআরটিএর কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, হেফাজতের তাণ্ডবে বিএনপি যে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত, তা আজ সবাই জানে। হেফাজতে ইসলাম সম্প্রতি যে তাণ্ডবলীলা চালায়, তার শুধু পৃষ্ঠপোষকতাই নয় বরং এসব সহিংস ঘটনায় জড়িত ছিল বিএনপি। সরকার গণবিচ্ছিন্ন বলে বিএনপি নেতাদের দাবির জবাবে তিনি বলেন, গত ১৩ বছর যাবত্ ধারাবাহিক ব্যর্থতার গ্লানিবোধ থেকে বিএনপি এসব কথা বলে। প্রকৃতপক্ষে সরকার নয়, বিএনপিই জনগণ থেকে প্রত্যাখ্যাত ও গণবিচ্ছিন্ন।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদও গতকাল বলেছেন, সরকার কোনো আলেম বা ধর্মীয় নেতাকে গ্রেফতার করছে না, গ্রেফতার করছে দুষ্কৃতকারীদের। সরকারি বাসভবন থেকে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা ও এটুআই আয়োজিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে স্থানীয় সাংবাদিকদের ভূমিকা’ শীর্ষক অনলাইন কর্মশালা উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বিএনপি মহাসচিবের ‘সরকার ধর্মীয় নেতাদের গ্রেফতার করছে’ এমন বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তথ্যমন্ত্রী একথা বলেন।

হাছান মাহমুদ বলেন, যেসব দুষ্কৃতকারী ২৬ থেকে ২৮ মার্চ সমগ্র দেশে তাণ্ডব চালিয়েছে, নিরীহ মানুষের ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পত্তি, যানবাহন জ্বালিয়ে দিয়েছে, ভূমি অফিসে আগুন দিয়ে সাধারণ মানুষের জমির দলিলপত্র পুড়িয়েছে, ফায়ার স্টেশন, রেল স্টেশনে হামলা করে ক্ষতি করেছে এবং যারা মানুষের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে, তাদের এবং তাদের নির্দেশদাতাদের সরকার গ্রেফতার করছে। তিনি বলেন, কোনো ভালো আলেম এসব অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। আলেমের মুখোশধারীরাই এসবে যুক্ত এবং সরকার তাদেরই গ্রেফতার করছে।

উল্লেখ্য, সোমবার ধর্মীয় সংগঠনের নেতা হিসেবে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের মুক্তি চেয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঐদিন ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানিয়ে তিনি বলেছেন, আলেমদের গ্রেফতার দেশের মানুষ মেনে নেবে না। লকডাউনের সুযোগ নিয়ে একটা ক্র্যাকডাউন করা হয়েছে। একদিকে বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ধর্মীয় নেতা যারা আছেন, যারা আলেম-ওলামা আছেন, তাদের নির্বিচারে গ্রেফতার করা হচ্ছে।