কেন অস্ত্রবিরতির জন্য ইসরাইলকে চাপ দিয়েছিলেন বাইডেন

108

ইসরাইল ও গাজা উপত্যকা শাসনকারী হামাসের মধ্যকার চলমান সহিংসতা নিয়ে গত রোববার বেশ কঠোর এক বিবৃতি দেন মার্কিন সিনেটর রবার্ট মেন্ডেজ। ইসরাইলের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত সিনেট ফরেইন রিলেশন্স কমিটির এই চেয়ারম্যানকে এমন প্রতিক্রিয়া দিতে দেখা যায়নি আগে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে হাওয়া বদলের অন্যতম ইঙ্গিত হলো মেন্ডেজের ওই বক্তব্য। তার ওই বিবৃতি হোয়াইট হাউজে বেশ হৈচৈ ফেলে দেয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

মেন্ডেজ বলেন, ইসরাইল সীমা অতিক্রম করেছে। গাজায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের কার্যালয় থাকা এক উঁচু ভবন ধসিয়ে দেয়ার পাশাপাশি অন্যান্য নানা কার্যক্রমের ব্যাখ্যা তাদের দিতে হবে। তিনি বলেন, এই সহিংসতার অবসান ঘটাতে হবে। প্রত্যেক নির্দোষ ইহুদি ও আরব বেসামরিক ব্যক্তির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ও শান্তি অর্জনের সম্ভাবনা পিছিয়ে দিচ্ছে।

মেন্ডেজ নিজের সহকর্মীদের সঙ্গে ইসরাইলের সমালোচনার ব্যাপারে আগেভাগে কিছু জানাননি। সহসা তার এমন বক্তব্য প্রেসিডেন্ট জো বাইডের পুরো প্রশাসনকেই চমকে দিয়েছিল।

হোয়াইট হাউজের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এখন অবদি কংগ্রেসের কোনো সদস্যই ইসরাইলের প্রতি বাইডেনের অবস্থান বদলাতে সক্ষম হননি। কিন্তু ইসরাইলের প্রতি সমর্থন ঘিরে মার্কিন রাজনীতির এই পরিবর্তনশীল আবহ চলমান সংঘাত নিরসনে দেশটির উপর চাপ সৃষ্টির সুযোগ করে দিয়েছে।

মার্কিন নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থানে নতুন এই পরিবর্তন গাজা-ইসরাইল সংঘাত নিয়ে বাইডেনের ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়ায়ও কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। তার প্রশাসনের জন্য এটাই প্রথম বড় পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত সংকট। অনেকের চোখে এ সংকট বাইডেন প্রশাসনকে অনেক অগ্রাধিকার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

অপরদিকে বাইডেনের দল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর তীব্র বিরোধিতাও মার্কিন-ইসরাইলি সম্পর্ককে এক সন্ধিক্ষণে ধাবিত করেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে নেতানিয়াহুর যে সখ্য ছিল তা থেকেও ডেমোক্রেটিক পার্টির সঙ্গে ইসরাইলের খানিকটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার টানা ১১ দিন লড়াই শেষে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ইসরাইল ও হামাস। স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, ইসরাইলি বোমা হামলায় অন্তত ৬৫ শিশুসহ ২৩২ জন ফিলিস্তিনি মারা গেছেন। পাশাপাশি ইসরাইলে দুই শিশুসহ ১২ জন মারা গেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই যুদ্ধবিরতি বন্ধের জন্য ইসরাইলি, আরব ও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে ৮০টিরও বেশি ফোনকল বিনিময় হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি ফোনকল বিনিময় হয়েছে বাইডেন ও নেতানিয়াহুর মধ্যে।

মিশরের এক প্রস্তাবে ইসরাইলি মন্ত্রিপরিষদ ও হামাস সমর্থন জানালে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। ইসরাইল জানায়, এই যুদ্ধবিরতি শর্তহীন। যদিও এর আগে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিমান হামলায় হামাসের বহু কমান্ডার হত্যা ও অবকাঠামো ধ্বংস করেছে তারা।

এই যুদ্ধবিরতির পেছনে নিজেদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে হোয়াইট হাউজ। অন্যবারের তুলনায় এবার সংঘাত কিছুটা আগে অবসান হওয়ায় জয় দাবি করে। কিন্তু বাইডেন তার বক্তব্যে মিসরকে মধ্যস্ততার কৃতিত্ব দেন, ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার তুলে ধরেন। একইসঙ্গে দলের মধ্যে ঘটতে থাকা পরিবর্তনের বিষয়ও যে ভুলে যাননি তা স্পষ্ট করেন। শুক্রবার তিনি বলেন, ইসরাইলের নিরাপত্তা নিয়ে আমার অবস্থানে কোনো বদল আসেনি। কোনো বদল আসেনি।

তিনি জানান, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, হামাসের জন্য সুবিধা তৈরি না করে কীভাবে গাজায় অবকাঠামো ও বাড়িঘর পুনঃনির্মাণ করা।

এরপর মার্কিন রাজনীতি নিয়ে তিনি বলেন, আমার মনে হয় আপনারা জানেনই যে, আমার দল এখনো ইসরাইলকে সমর্থন করে। একটা বিষয় এখানে স্পষ্ট করে দেওয়া উচিৎ। পুরো অঞ্চল যতদিন না সর্বসম্মতভাবে ইসরাইলকে স্বাধীন ইহুদিরাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে ততদিন শান্তি আসবে না।

ইসরাইল-হামাস সংঘাত নিয়ে মার্কিন অবস্থানে পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেখা যায় ১৫ই মে। সেদিন গাজায় বার্তা সংস্থা এপি ও কাতার-ভিত্তিক গণমাধ্যম আল-জাজিরাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কার্যালয় থাকা একটি ভবন বিমান হামলায় গুঁড়িয়ে দেয় ইসরাইল। তাদের দাবি, ভবনটিতে হামাসের যোগাযোগ বিষয়ক সরঞ্জাম ছিল। নাম না প্রকাশের শর্তে, হোয়াইট হাউজ কর্মকর্তারা জানান, এই হামলার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রকে আগ থেকে কিছু জানায়নি ইসরাইল।

ওই ভবন ধ্বংসের পেছনে ইসরাইলের যুক্তি নিয়ে সবার আগে প্রকাশ্যে সন্দেহ প্রকাশ করেন ডেমোক্রেট কংগ্রেসওমেন রাশিদা তালিব। এর পরপর সিনেটর ম্যান্ডেজও একইরকম বিবৃতি দিলে হোয়াইট হাউজের ভেতর সংশয় দ্বিধা জোরালো হতে শুরু করে। ইসরাইলকে সমর্থন দেওয়া ও দেশে জোরালো হতে থাকা অসন্তুষ্টি নিয়ে সংকটের মুখোমুখি হন নেতারা।

ইসরাইলের ওই হামলার পর মেন্ডেজ তার সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়ায় অবশ্য ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকারের কথাও উল্লেখ করেন। কিন্তু সাথে এও বলেন যে, ‘আমি ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে গাজায় নির্দোষ বেসামরিকদের মৃত্যু এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কার্যালয় থাকা ভবনে বিমান হামলার ঘটনায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মেন্ডেজ ওই বিবৃতি দেওয়ার পর থেকে বাইডেনের সাথে তার কথা হয়নি।
মেন্ডেজের ওই বক্তব্য বাইডেন প্রশাসনকে নেতানিয়াহুর সমালোচনার পথ সুগম করে দিয়েছিল। বাইডেন প্রশাসনের দিক থেকে ইসরাইলকে তাদের দাবি প্রমাণ করতে এবং এই সংঘাতের ইতি টানতে চাপ দেওয়া শুরু হয়। কেবল ইসরাইলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন থেকে সরে এসে নেতানিয়াহুর উপর চাপ বাড়তে থাকে তখন থেকেই।

এর আগে ১২ই মে, সংঘাত শুরুর দুই দিন পর নেতানিয়াহুর সাথে প্রথম ফোনে কথা বলেন বাইডেন। পরবর্তীতে এই ফোনালাপের বিষয়বস্তু প্রকাশ পেলে জানা যায় যে, ওই ফোনালাপে হামাসের রকেট হামলার সমালোচনা করেন বাইডেন। ইসরাইলের নিরাপত্তার প্রতি তার দৃঢ় সমর্থনের কথাও ব্যক্ত করেন।

পরের দিন দেওয়া এক বক্তব্যেও ইসরাইলের প্রতি তার সমর্থন কোনো রাখঢাক না রেখেই প্রকাশ করেন বাইডেন। যুদ্ধের ওই তিন দিনে ফিলিস্তিনে দুই শিশুসহ অন্তত ৮৫ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান। একইসময়ে ইসরাইলে মারা যান দুই জন।

১৫ই মে আবার নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা হয় বাইডেনের। এদিনও ইসরাইলের প্রতি নিজের সমর্থন ধরে রাখেন বাইডেন। তবে শেষবারের তুলনায় এবারের সমর্থন ছিল কিছুটা সংযত। হোয়াইট হাউজ পরবর্তীতে জানায়, ফোনালাপে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বাইডেন।

পরের দিন কোপেনহ্যাগেনে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিনকেন জানান, ইসরাইলের ওই বিমান হামলা নিয়ে তাদের কাছে আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো তথ্য সরবরাহ করেনি নেতানিয়াহু সরকার। এরপর মার্কিন কর্মকর্তারা আরো চাপ দিলেও হামলার ব্যাপারে তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করেনি ইসরাইল। এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইসরাইলের আচরণে বাইডেনের সহযোগীদের মধ্যে হতাশা ও বিস্ময় দেখে গেছে।

এদিকে, নিজ দেশে দুর্নীতির মামলায় জর্জরিত নেতানিয়াহুর জন্য মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সমালোচনা নতুন করে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কংগ্রেসওমেন তালিবের মতো আইনপ্রণেতারা ইসরাইলের তীব্র সমালোচক হয়ে উঠেছেন। সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় হোয়াইট হাউজের এক সেশনে তিনি বলেন, বহুদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের প্রতি অমানবিক ও জাতিবিদ্বেষী আচরণকারী এই ব্যবস্থার অবসান ঘটানো আমাদের দায়িত্ব।

বৃহস্পতিবার ইসরাইলের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ৭৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের অস্ত্র বিক্রির এক চুক্তি ঠেকাতে পার্লামেন্টে প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন ইহুদী সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স।

ওদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক এ মিলি সংঘাতের দিনগুলোয় প্রায় দিনই ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। ইসরাইল কোন কোন টার্গেটে হামলা চালাতে চায় সে বিষয়ে তাদের ভালো ধারণা ছিল বলে জানান কর্মকর্তারা। কিন্তু যখন ইসরাইলের টার্গেটের তালিকা ছোট হয়ে আসতে শুরু করে, তখন মার্কিন নেতাদের ধৈর্য্যও সীমিত হতে থাকে। তারা যুক্তি দেখান, প্রাণহানি বিবেচনা করে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর হামলাগুলোয় ভারসাম্যতা বজায় রাখা উচিৎ এবং সংঘাতটিকে বেশি দূরে নিয়ে যাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিৎ।

অবশেষে চলতি সপ্তাহে মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে ইসরাইল নিয়ে পরিবর্তনের ব্যাপারটি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে।
সোমবার নেতানিয়াহুর সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর থেকে তৃতীয়বারের মতো ফোনে কথা বলেন বাইডেন। এসময় যুদ্ধবিরতির প্রতি সমর্থন জানান তিনি। এখানে উল্লেখ্য, ইসরাইল ‘যুদ্ধবিরতি’ সাধারণত প্রত্যাখ্যান করে থাকে, কেননা এর মানে হচ্ছে দুই সরকারের মধ্যে যুদ্ধ থামানো। সে হিসেবে, হামাসকে পরোক্ষভাবে বৈধতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে বুধবার চতুর্থবারের মতো নেতানিয়াহুর সাথে ফোনালাপ হয় বাইডেনের। এই ফোনালাপেই সাম্প্রতিক সংঘাত নিয়ে সবচেয়ে বড় সতর্কতা দেন বাইডেন। হোয়াইট হাউজের প্রকাশিত বিবৃতিতে দেখা যায়, ওই ফোনালাপে ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেননি বাইডেন। হোয়াইট হাউজ জানায়, নেতানিয়াহুর কাছে ওই দিনের মধ্যেই যুদ্ধবিরতি ও সংঘাত ত্বরিত প্রশমন প্রত্যাশা করছেন বাইডেন।

তিনি নেতানিয়াহুকে বলেন যে, সংঘাত আরও এগিয়ে নিয়ে গেলে ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক অঙ্গনের অবস্থা নেতানিয়াহুর জন্য আরো কঠিন হয়ে উঠবে। জানান, তিনি প্রত্যাশা করছেন যে ওইদিনের মধ্যেই সংঘাত থামাবে ইসরাইল। বাইডেনের এমন আচরণ নজিরবিহীন।

অবশ্য, বাইডেনের কথায় তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেননি নেতানিয়াহু। বুধবার সারাদিন বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এর পরদিনও হামলা চলেছে, যুদ্ধবিরতির আগ পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার নেতানিয়াহুর সঙ্গে আরো দুইবার ফোনে কথা বলেন বাইডেন। এর মধ্যে একটি ছিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর।

(ওয়াশিংটন পোস্ট অবলম্বনে)