তুরস্কের এই মসজিদটি এরদোগানের জন্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

111

তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এরদোগানের সঙ্গে মসজিদের সম্পর্ক গত কয়েক বছর ধরে সামনে চলে এসেছে। মসজিদে গিয়ে কোরআন তেলাওয়াত করা, ঘোষণা দিয়েই বিভিন্ন মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়া ইত্যাদি। আর শুক্রবার জুমা নামাজের পরে মসজিদে থেকে বের হয়েই ক্যামেরার সামনে এসে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঘোষণা দেওয়াকে তো এখন তিনি রীতিমত একটি পলিটিক্যাল কালচারে পরিণত করেছেন।

পুরাতন মসজিদ সংস্কার, নতুন মসজিদ তৈরি এবং মসজিদ উদ্বোধনে এরদোগান হয়তো মুসলিম বিশ্বে এখন সেরা।

শুধু দেশেই নয়, দেশের বাইরে যেমন, আমেরিকা, জার্মানি, ব্রিটেন, ঘানা, জাপান, কসোভো, দক্ষিণ মেসিডোনিয়া, আলবেনিয়া , কাজাখস্তান, রাশিয়া, বেলারুশ, সোমালিয়া, হাইতি, ফিলিস্তিন, কিরগিজিস্তান, উত্তর সাইপ্রাস, জিবুতি, সুইডেন, চাঁদ, আইভরি কোস্ট এবং ভেনিজুয়েলাসহ অনেক দেশে মসজিদ করেছেন তিনি।

আর দেশের মধ্যে তার করা মসজিদের তো হিসেব রাখাই কঠিন। তবে ইস্তানবুলের চামলিজা পাহাড়ের উপরে তিনি তৈরি করেছেন সবচেয়ে বৃহৎ মসজিদ। এছাড়াও ঐতিহাসিক আয়া সুফিয়াকে ৮০ বছর পরে মিউজিয়াম থেকে মসজিদে রূপান্তরিত করে তো তিনি সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। যেমন কুড়িয়েছেন প্রশংসা তেমন প্রচুর সমালোচনাও।

তবে নতুন মসজিদ তৈরির ক্ষেত্রে এরদোগানের জন্য সবচেয়ে চালেঞ্জিং ছিল ইস্তানবুলের বিখ্যাত তাকসিম ময়দানে তৈরি করা নতুন মসজিদটি।

আসলে এই মসজিদ তৈরির সঙ্গে আমারও ছোট্ট একটা স্মৃতি জড়িত আছে। আজ থেকে প্রায় ১০-১২ বছর আগের কথা। আমি তখন সাংবাদিকতার তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। সামারের ছুটিতে কাজ করছি একটি লোকাল সংবাদপত্রে। দায়িত্ব পড়ল তাকসিমে একটি বিক্ষোভ হচ্ছে সেই বিক্ষোভকে কভার করার। বিক্ষোভটি ছিল তাকসিমে একটি মসজিদ করার গোপন পরিকল্পনার বিরুদ্ধে। তুরস্কের অনেক বড় বড় সাংস্কৃতিমনা কবি সাহিত্যিক নাট্যকার জমায়েত হয়েছিলেন সেখানে। পরবর্তীতে খবরটি ছাপানো হোলো। এটিই ছিল আমার সাংবাদিক জীবনের প্রথম প্রকাশিত খবর। এবং হেডলাইন ছিল ‘আমরা তাকসিমে মসজিদ করতে দেব না।’

আসলে তখন আমিও ধারণা করিনি যে, ওখানে একটা মসজিদ গড়া সম্ভব।

তাই এই‌ মসজিদটি এরদোগানের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সফলতা হিসেবে দেখছেন অনেকেই। তার জন্য এটা একটি মসজিদের চেয়েও অনেক বড় অর্থ বহন করে।

তাইতো তিনি করোনা মহামারীকে উপেক্ষা করে বিশাল জাঁকজমক করেই হাজার হাজার মুসল্লীদের নিয়ে উদ্বোধন করলেন এই মসজিদটি।

এই মসজিদটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

এই মসজিদটি তিনি এমন এক জায়গায় করলেন, যেখানে কখনও মসজিদ করা সম্ভব না বলে সবাই ধারণা করতো। কারণ তাকসিম ময়দান ইস্তানবুলের সাধারণ কোন জায়গা নয়। মুসলমানদের জন্য সুলতান আহমেত ময়দান যেমন গুরুত্বপূর্ণ অমুসলিমদের জন্য তাকসিম তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। তাকসিমে বসবাস করে প্রচুর অমুসলিম লোকজন। উসমানীয় শাসনামলে এই তাকসিম এবং এর চারপাশেই ছিল পশ্চিমা দেশগুলোর দূতাবাস। আর এই দূতাবাসগুলো ঘিরেই গড়ে উঠে ইহুদি, খ্রিস্টানদের বিশাল বসতি।

একারণেই, তাকসিম ময়দানের আশেপাশে ৫০টির মত গির্জা এবং সিনাগগ থাকলেও মসজিদ আছে শুধু একটি। ১৫৯৭ সালে তৈরি আগা জামি নামের এই ক্ষুদ্র মসজিদটিই ছিল বিশাল তাকসিম অঞ্চলে মুসলমানদের একমাত্র ইবাদতের স্থান।
উসমানীয়রা ইস্তানবুলে বহু মসজিদ তৈরি করেছেন। বিশাল বিশাল মিনারের মসজিদগুলো দেখলে আপনার সত্যি মনে হবে যে ইস্তানবুল আসলেই একটি মসজিদের শহর। কিন্তু ৩০০ বছর ধরে সেই উসমানীয়রা পর্যন্ত তাকসিম ময়দানে আর কোন মসজিদ নির্মাণ করেনি, করার প্রয়োজন পড়েনি, অথবা করার সাহস পায়নি। ইস্তানবুলের প্রায় সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ ময়দানেই মসজিদ আছে। কিন্তু এই তাকসিম ময়দান – যা হয়ে উঠে আধুনিক তুরস্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান — এ জায়গাটা থাকে মসজিদ শূন্য।

১৮৭৫ সালের দিকে এই অঞ্চলে একটি মসজিদ করার জন্য প্রথম পরিকল্পান গ্রহণ করেন তখনকার সুলতান। কিন্তু তখন তুরস্ক-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে সে প্ল্যান ভেস্তে যায়।

পরবর্তীতে কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে আধুনিক এবং সেক্যুলার তুরস্ক গঠনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে তাকসিম ময়দানের গুরুত্ব। দেশটির অনেক বড় বড় আন্দোলনের সাক্ষী হয়ে থাকে এই ময়দান।

সামরিক অভ্যুত্থান যেমন আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসের অভেদ্য অংশ। এই মসজিদটির ইতিহাসেও সামরিক অভ্যুত্থান তেমনই ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

স্বাধীনতার ত্রিশ বছর পরে প্রথম গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান আদনান মেন্দেরেস তাকসিমে একটি মসজিদ করার জন্য পরিকল্পনা হাতে নেন। সে ক্ষেত্রে তিনি মসজিদটি গড়ার জন্য একটি ট্রাস্টও গঠন করেন। কিন্তু ১৯৬০ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। সামরিক জান্তা বাতিল কোরে দেয় মসজিদ তৈরির প্রকল্পটি।

১৯৬৫ সালে তাকসিমে একটি মসজিদ করার জন্য সরকারি জমি বরাদ্দে প্রধানমন্ত্রী সুলেয়মান দেমিরেল ক্যাবিনেটে একটি প্রস্তাব পাস করেন। কিন্তু ১৯৭১ সালে সামরিক বাহিনী তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে প্লানটি আবারও বাতিল করে দেয়।
পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে গঠিত গণতান্ত্রিক সরকার মজিসদের প্রকল্পটি অনুমোদন করে। কিন্তু তখন তুরস্কের সেক্যুলার রাজনৈতিক দল সিএইচপি এর বিরুদ্ধে মামলা করলে আদালত প্রজেক্টটি বাতিল করে।

১৯৮০ সালে নতুন সরকার আবার মসজিদ প্রকল্পটি ক্যাবিনেটে পাশ করায়। কিন্তু সে বছরই আবার সামরিক অভ্যুত্থান হলে সামরিক সরকার প্রস্তাবিত ওই মসজিদের জায়গায়টি কার পার্কিং এর জন্য বরাদ্দ করে।

১৯৮৫ সালের দিকে তখনকার প্রধানমন্ত্রী তুরগুত ওযাল এই মসজিদ গড়ার জন্য একটা ট্রাস্ট গঠন করেন। কিন্তু পরে আর কোন অগ্রগতি হয়নি।

১৯৯৪ সালে এরদোগান ইস্তানবুলের মেয়র নির্বাচনের সময় তাকসিমে একটি মসজিদ করার প্রতিশ্রুতি দেন। আর ১৯৯৬ সালে নাজিমুদ্দিন এরবাকানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠন হলে মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। কিন্তু এক বছর পরে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যেম নাজিমউদ্দিন এরবাকানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে আবার ভণ্ডুল হয়ে যায় এই প্ল্যান।

এরপর শুরু হয় এরদোগানের শাসনামল। তবে ২০১২ সাল পর্যন্ত তার ক্ষমতার প্রথম ১০ বছরে এ মসজিদ নিয়ে কোনো কথাই বলেননি। ২০২১ সালে এসে তা বাস্তবায়ন করলেন।