ভয়াবহ যাচ্ছে একেকটি দিন

43

করোনা ভাইরাস মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ যে সময় থেকে দেশে আঘাত হেনেছে, তার পর যেন একেকটি দিন নতুন নতুন ভয়াবহতা নিয়ে হাজির হচ্ছে। ভাইরাসটির ডেল্টা ধরনের বিস্তারে সংক্রমণ ও মৃত্যু রেকর্ড গড়ে চলেছে প্রতিদিন। তারই ধারাবাহিকতায় এবার একদিনে আড়াই শতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর এলো।

আগের দিন সকাল ৮টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার একই সময় পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে রেকর্ড ২৫৮ জন মারা গেছেন করোনা আক্রান্ত হয়ে। একই সময়ে দেশে ৫২ হাজার ৪৭৮টি নমুনা পরীক্ষায় নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৯২৫ জন। নমুনা পরীক্ষা অনুযায়ী রোগী শনাক্তের হার ২৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এর একদিন আগেই গত সোমবার দেশে রেকর্ড ১৫ হাজার ১৯২ জন রোগী শনাক্ত হয়।

ওইদিন মারা গিয়েছিলেন ২৪৭ জন। অর্থাৎ গত ২৭ দিনে করোনায় দেশে প্রাণ হারিয়েছেন ৫ হাজার ২৭৬ জন মানুষ। এ নিয়ে দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৭৫২ জন এবং মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ১৯ হাজার ৭৭৯ জনে। সামনের দিনগুলোয় মৃত্যু আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. আবু জামিল ফয়সাল।

চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হলেও জুন মাসে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। ওই মাসেই সারাদেশে করোনার ডেল্টা বা ভারতীয় ধরন ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জুনের প্রথম সপ্তাহে সংক্রমণের হার ছিল ৯-১১ শতাংশ। সেটি বেড়ে একই মাসের শেষ সপ্তাহে পৌঁছায় ২৪-২৫ শতাংশে।

সংক্রমণ চলতি জুলাই মাসে আরও ভয়ঙ্কর আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এখন গ্রাম-শহর সবখানেই রোগীর ছড়াছড়ি। চলতি মাসে করোনার সংক্রমণ হার ৩২ শতাংশের ওপরে উঠেছে। এ মাসে প্রতিদিন গড়ে ১৯৫ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন। এর আগে গত জুনে ১ হাজার ৮৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেই হিসাবে ওই মাসে প্রতিদিন গড়ে ৬২ জনের মৃত্যু হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত মোট নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৭৫ লাখ ৫৮ হাজার ৭১১টি। মোট নমুনা পরীক্ষায় রোগী শনাক্তের হার ১৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় যারা মারা গেছেন তাদের মধ্যে ১৩৮ জন পুরুষ এবং ১২০ জন নারী। এর মধ্যে ৯১ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে ২ জন, ৮১ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে ১৭, ৭১ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে ৫০, ৬১ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে ৭৮, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ৫৪, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ৩১, ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ১৬, ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ৮ এবং ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে ২ জন রয়েছেন। মৃতদের অঞ্চল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এদিন ঢাকা বিভাগে ৮৪ জন, চট্টগ্রামে ৬১, রাজশাহীতে ২১, খুলনায় ৫০, বরিশালে ১৩, সিলেটে ৭, রংপুরে ১১ ও ময়মনসিংহে ১১ জন মারা গেছেন। এই ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন ১২ হাজার ৪৩৯ জন।

জানা গেছে, দেশে এখনো ১৮ জেলায় সংক্রমণের হার ৪০ শতাংশের বেশি। জেলাগুলো হলো- কুষ্টিয়া, পঞ্চগড়, শরীয়তপুর, ঝালকাঠি, রাঙামাটি, ঝিনাইদহ, শেরপুর, রাজবাড়ী, বাগেরহাট, বরিশাল, সিরাজগঞ্জ, মাগুরা, ভোলা, খুলনা, কিশোরগঞ্জ, ফরিদপুর, মেহেরপুর ও মুন্সীগঞ্জ। ৩০ শতাংশের বেশি যেসব জেলায় সংক্রমণ রয়েছে সেগুলো হলো- ঠাকুরগাঁও, চট্টগ্রাম, মাদারীপুর, পটুয়াখালী, গাজীপুর, ফেনী, কুমিল্লা, সিলেট, দিনাজপুর, চাঁদপুর, মানিকগঞ্জ, রংপুর, চুয়াডাঙ্গা, জামালপুর, নোয়াখালী, লালমনিরহাট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ঢাকা, রাজশাহী, নরসিংদী, নাটোর, গাইবান্ধা, লক্ষ্মীপুর, গোপালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, বগুড়া ও টাঙ্গাইল।

এমন পরিস্থিতিতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি ডা. আবু জামিল ফয়সাল। তিনি করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় গৃহীত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পর্যালোচনা ও সমন্বয়ের লক্ষ্যে সরকারের গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত। এই জনস্বাস্থ্যবিদ আমাদের সময়কে বলেন, করোনার সংক্রমণ বেড়েছে, এ কারণে মৃত্যুও বেড়েছে। ভাইরাসের গতিবিধি বলা মুশকিল। আমরা এখন সংক্রমণের চূড়ার দিকে যাচ্ছি। সংক্রমণ ও মৃত্যু আমরা থামাতে পারছি না। আমাদের মৃত্যু যেভাবে চলছে, এটা এভাবে চলতে থাকবে। সামনের দিনগুলোয় মৃত্যু আরও বাড়বে। এর কারণ আমাদের রোগী বেড়ে যাচ্ছে। রোগী বাড়লে মৃত্যু বাড়বেই। সংক্রমণ প্রতিরোধে আমরা যে আস্তে আস্তে কাজ করছি, এভাবে সংক্রমণ থামানো যাবে না। সংক্রমণ থামাতে হলে একটি সামাজিক আন্দোলন শুরু করতে হবে। এ জন্য দেশে রেড অ্যালার্ট জারি করা দরকার। রেড অ্যালার্ট জারির পর মন্ত্রী, এমপি, জনপ্রতিনিধিসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক আন্দোলন এগিয়ে নিতে হবে। সামাজিক আন্দোলন শুরু হলে দেশের মানুষ সচেতন হবে, মাস্ক পরবে, স্বাস্থ্যবিধি মানবে, টেস্ট করবে, আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টিনে থাকবে। তখনই কেবল সংক্রমণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে।

এদিকে সংক্রমণ ও মৃত্যুর বাড়বাড়ন্তের মাঝেই চলছে গণটিকাদান কার্যক্রম। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, টিকার জন্য গত ২৬ জুলাই পর্যন্ত মোট নিবন্ধন করেছেন ১ কোটি ২৬ লাখ ১২ হাজার ৪৪৭ জন। এর মধ্যে প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন ৭৭ লাখ ৭৭ হাজার ৪৩০ জন। দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিয়েছেন ৪৩ লাখ ১০ হাজার ৪৪৩ জন। মোট টিকা নিয়েছেন ১ কোটি ২০ লাখ ৮৭ হাজার ৮৭৩ জন। এর মধ্যে প্রথম ডোজে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নিয়েছেন ৫৮ লাখ ২০ হাজার ৩৩ জন। দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ৪২ লাখ ৯৮ হাজার ৮৬ জন। প্রথম ডোজে ফাইজারের টিকা নিয়েছেন ৫০ হাজার ২৩৫ জন এবং দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ২৮৮ জন। সিনোফার্মের টিকা প্রথম ডোজ নিয়েছেন ১৪ লাখ ৮৫ হাজার ২১২ জন এবং দ্বিতীয় ডোজে নিয়েছেন ১২ হাজার ৬৯ জন। মর্ডানার টিকা প্রথম ডোজ নিয়েছেন ৪ লাখ ২১ হাজার ৯৫০ জন। তবে এই টিকার দ্বিতীয় ডোজ প্রদান এখনো শুরু হয়নি।