ওসি প্রদীপের নির্দেশে সিনহাকে হত্যা করা হয়

54

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। সোমবার (২৩ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টায় কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে দেশের আলোচিত এই মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু করা হয়।

টানা তিন দিন এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম। এই তিন দিনে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য মামলার ৮৩ জন সাক্ষীর মধ্যে বাদীসহ ১৫ জনকে সমন জারি করা হয়।

পিপি ফরিদ বলেন, প্রথম দিন মামলার বাদী সিনহার বড় বোন শারমিন ফেরদৌসের সাক্ষ্য ও জেরা আংশিক শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার (২৪ আগস্ট) মামলার আসামি লিয়াকত আলী, প্রদীপ কুমার দাশ ও লিটন মিয়ার পক্ষে তাদের আইনজীবীরা বাদী শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌসকে জেরা করবেন।

সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল বাদী শারমিন ফেরদৌসকে আসামীত্রয়ের পক্ষে অবশিষ্ট জেরা মঙ্গলবার সকাল থেকে শুরু করার আদেশ দিয়ে সিনহা হত্যা মামলার কার্যক্রম সাময়িক মুলতবি ঘোষণা করে দিনের অন্যান্য কার্যক্রমে চলে যান। মামলার অবশিষ্ট ১২ জন আসামির পক্ষে বাদী শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌসকে সোমবার জেরা সম্পন্ন করা হয়। সাক্ষ্য প্রদানের সময় ওসি প্রদীপ-লিয়াকতসহ মামলার ১৫ আসামি কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষ্যগ্রহণ আগামি ২৫ আগস্ট পর্যন্ত চলবে।

নোটিশ পাওয়া সাক্ষীরা হলেন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস, সিনহার সঙ্গী সহিদুল ইসলাম সিফাত, টেকনাফের মিনাবাজার এলাকার মোহাম্মদ আলী, শামলাপুর এলাকার মো. আবদুল হামিদ, মো. ইউনুছ, ফিরোজ মাহমুদ, মহিবুল্লাহ, মো. আমিন, মো. কামাল হোসেন ও মো. শওকত আলী, রামু সেনানিবাসের সার্জেন্ট মো. আয়ুব আলী, সিনহার সঙ্গী শিপ্রা দেবনাথ, কক্সবাজার সদর হাসপাতালের দুই চিকিত্সক শাহীন আবদুর রহমান চৌধুরী ও রণধীর দেবনাথ এবং টেকনাফের বাহারছড়ার মারিষবুনিয়া গ্রামের হাফেজ জহিরুল ইসলাম।

মামলার বাদী ও প্রধান সাক্ষী সিনহার বোন শারমিন ফেরদৌস বলেন, ‘সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশের নির্দেশে বরখাস্ত হওয়া ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলীর গুলিতে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান নির্মমভাবে খুন হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ জেনে আমি মামলা দায়ের করেছি এবং বিজ্ঞ আদালতেও একই তথ্য তুলে ধরেছি।’

সিনহা হত্যার বিচারের রায়ের দিকে সারা দেশের মানুষ তাকিয়ে আছে উল্লেখ করে ওসি প্রদীপ-লিয়াকতসহ জড়িতের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন শারমিন ফেরদৌস।

কক্সবাজার আদালত চত্বরে ওসি প্রদীপের আইনজীবী রানা দাশ গুপ্ত বলেন, আজকে সাক্ষীদের অন্য আসামির আইনজীবীরা জেরা করেছেন। কালকে প্রদীপ-লিয়াকতের পক্ষে সাক্ষীদের জেরা করা হবে। আশা করি কালকেই জেরা সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, ‘গত ২৭ জুন এ মামলার সার্চ গঠন করা হয়েছে। সার্চ গঠন ও আদেশ জারির পরদিনই মামলার সইমুহুরি নকলের জন্য আবেদন করেছিলাম। আমরা এখনো সেই নকল পাইনি। বিষয়টি আদালতেকে অবগত করার পর আদালত মঙ্গলবার সাক্ষীদের জেরা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।’

এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এ মামলার ১৫ জন আসামিকে কড়া পুলিশ পাহারায় কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে বিকেল ৫টার দিকে একইভাবে তাদের কক্সবাজার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

এদিকে স্বাক্ষ্যগ্রহণকালে সোমবার দুপুরের দিকে আদালত চত্বরে সিনহা হত্যা মামলার শীর্ষ দুই আসামি টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগীরা। ‘অসহায় নির্যাতিত সমাজ ও লাভ বাংলাদেশের’ ব্যানারে এ মানববন্ধন করা হয়।

মানববন্ধনে বিভিন্ন সময়ে বন্দুকযুদ্ধে নিহতের স্বজনেরা ছাড়াও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের জেলা সভাপতি নাজনীন সরওয়ার কাবেরী ও আমরা কক্সবাজারবাসী সংগঠনের সমন্বয়ক মহসীন শেখসহ নির্যাতিত অর্ধশতাধিক পরিবারের দুই শতাধিক লোক উপস্থিত ছিলেন। এ সময় তারা ওসি প্রদীপ-লিয়াকত বাহিনীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে ফাঁসির দাবি করেন।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর চেকপোস্টের গাড়ি তল্লাশিকে কেন্দ্র করে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। এ ঘটনায় করা হত্যা মামলায় ঐ বছরের ১৩ ডিসেম্বর ওসি প্রদীপ কুমার দাসসহ ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা র্যাব-১৫-এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. খায়রুল ইসলাম।